বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে আফগানিস্তানের মোল্লাতান্ত্রিক মানসিকতার দিকে এগোচ্ছে? আজ রিকশায় শাড়ি পেঁচিয়ে পর্দার ব্যবস্থা করার একটা দৃশ্য দেখলাম। দৃশ্যটা আসলে শুধু একটুকরো কাপড়ের পর্দা না। এর পেছনে যে সামাজিক মানসিকতা তৈরি হচ্ছে, সেটাই বেশি উদ্বেগের।
কেউ ব্যক্তিগতভাবে পর্দা করতে চাইলে করবেন। এতে আপত্তির কিছু নেই। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী পোশাক পরার অধিকার প্রত্যেক মানুষের আছে। আপত্তি তখনই শুরু হয়, যখন নারীর স্বাধীনতা, চলাফেরা আর উপস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করাটা ধর্মীয় নৈতিকতার নামে "স্বাভাবিক" বানিয়ে ফেলা হয়।
এটা শুধু একটা বিচ্ছিন্ন দৃশ্য না। এই এক টুকরো কাপড়ের পেছনের মানসিকতা ইতিমধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এক নির্দেশনা জারি করে নারী কর্মীদের শাড়ি-সালোয়ার কামিজ-ওড়না "সাদামাটা" পরতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছিল, সঙ্গে ছোট হাতা বা ছোট দৈর্ঘ্যের পোশাক আর লেগিংস নিষিদ্ধ করেছিল। আর না মানলে শাস্তির হুমকিও ছিল। ব্যাপক সমালোচনার মুখে তিন দিনের মাথায় নির্দেশনাটা প্রত্যাহার করতে হয়েছিল, কিন্তু এই ঘটনা দেখিয়ে দেয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও নারীর পোশাক নিয়ন্ত্রণের এই মানসিকতা কতটা স্বাভাবিকভাবে ঢুকে পড়েছে। রিকশার পর্দা আর ব্যাংকের নির্দেশনা দুটো ভিন্ন জায়গার ঘটনা মনে হলেও, দুটোর মূল সুরই এক: নারীর শরীর ও উপস্থিতিকে "নিয়ন্ত্রণযোগ্য বিষয়" হিসেবে দেখা।
আফগানিস্তান কীভাবে শুরু হয়েছিল? আফগানিস্তানের তালেবানরা ঠিক এই মানসিকতারই সবচেয়ে চরম রাজনৈতিক রূপ দেখিয়েছে। কিন্তু সেটা রাতারাতি হয়নি। শুরুটা হয়েছিল ছোট ছোট ধাপে। আগে পোশাকের "পরামর্শ", তারপর "নির্দেশনা", তারপর "বাধ্যবাধকতা", তারপর আইন। প্রতিটা ধাপেই সমাজের একটা অংশ বলেছে এটা তো সামান্য বিষয়, এত বাড়াবাড়ির কী আছে। যতদিনে বোঝা গেছে এটা সামান্য না, ততদিনে নারীর শিক্ষা, চাকরি, চলাফেরা সব কিছুর ওপরই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ আফগানিস্তান না। বাংলাদেশের সমাজও আফগান সমাজ না। কিন্তু নারীর স্বাধীনতা সংকুচিত করার যে মানসিকতা সেখানে দেখা গেছে, তার ছোট ছোট সামাজিক প্রকাশকে "স্বাভাবিক" ভাবার কোনো কারণ নেই।
আজ রিকশায় পর্দা। আগামীকাল হয়তো বলা হবে, নারী একা বাইরে যাবে না। তারপর বলা হবে, নির্দিষ্ট পোশাক ছাড়া বাইরে যাওয়া যাবে না। তারপর বলা হবে, মেয়েদের অমুক জায়গায় পড়াশোনা করা উচিত না। তারপর বলা হবে, নারীর কাজ করার দরকার নেই। এভাবেই একটা ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশীলন একসময় সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কাঠামোয় রূপ নিতে পারে আর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, এই ধাপগুলো শুধু কল্পনা না, বাস্তবেই ঘটার চেষ্টা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই এটা না যে, নারী পর্দা করছেন কি না। প্রশ্ন হলো, তিনি কি নিজের ইচ্ছায় পর্দা করছেন? নাকি এমন একটা সমাজ তৈরি হচ্ছে, যেখানে পর্দা না করলে তাকে চরিত্রহীন, অধার্মিক বা অসামাজিক তকমা দেওয়া হবে?
একজন নারীর নিরাপত্তার জন্য রিকশায় কাপড়ের পর্দা লাগানোর দরকার হলে, প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত কেন একজন নারীকে নিরাপদ রাখতে কাপড়ের দেয়াল প্রয়োজন হচ্ছে? অপরাধীর হাত থামানোর বদলে নারীর চারপাশে পর্দা টাঙানো হচ্ছে কেন? রাষ্ট্রের দায়িত্ব অপরাধীকে নিয়ন্ত্রণ করা, নারীর স্বাধীনতা সীমিত করা না।
বাংলাদেশকে এমন সমাজ হতে হবে, যেখানে একজন নারী পর্দা করতে চাইলে স্বাধীনভাবে করবেন, আবার না করতে চাইলে তিনিও সমান স্বাধীনভাবে রাস্তায় হাঁটবেন। ধর্ম থাকবে, বিশ্বাস থাকবে, ব্যক্তিগত পছন্দ থাকবে। কিন্তু নারীর স্বাধীনতার ওপর ধর্মীয় বা সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে প্রশ্ন করতেই হবে।
কারণ তালেবান হওয়ার শুরু সবসময় বন্দুক হাতে হয় না। কখনো কখনো শুরু হয় একটা রিকশার পর্দায়, একটা অফিসের নির্দেশনায়, মানুষের চিন্তার ভেতর দিয়ে। আর সেই চিন্তাকে ধীরে ধীরে "স্বাভাবিক" বানিয়ে ফেলাই সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিবর্তন।
...
All reactions:
2 comments
1 share
Like
Comment
Most relevant
Mohammad Nobiul Islam
বাংলাদেশ ২.০।
নিভৃতে কেঁদে চলছে দেশমাতৃকা।
Gazi Feroz
ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে এটা একটা শোভাযাত্রার অংশ বিশেষ ছিল।