নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও সামগ্রিক পরিস্থিতিতে নেতিবাচক দিকই বেশি বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে।
একই সময়ে দেশের তিন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে বছরের প্রথম আট মাসে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর ফলে সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীতে সিপিডি আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও খুব একটা অনুকূল ছিল না।
তবে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময়কার অর্থনৈতিক অবস্থার একটি সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক চিত্র তৈরি না হওয়াকে বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন তিনি। তার মতে, এ ধরনের দলিল না থাকায় বর্তমানে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে পরিসংখ্যান মিলিয়ে মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, নতুন সরকারের কাছে মূল প্রত্যাশার মধ্যে ছিল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন নিশ্চিত করা। মূল্যস্ফীতি কমানো, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করার প্রত্যাশা থাকলেও এসব ক্ষেত্রে এখনো অস্বস্তির জায়গা রয়েছে।
সিপিডি জানিয়েছে, সরকারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি ও উদ্যোগ মূল্যায়নে তারা প্রায় ৩৬২টি পদক্ষেপ চিহ্নিত করেছে। এসব উদ্যোগকে নয়টি ভাগে বিভক্ত করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
সুশাসন নিয়ে ১০৫টি ঘটনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি সংসদ সদস্যদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছে সিপিডি।
তবে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার সরকারি অঙ্গীকারের ক্ষেত্রেও কিছু ব্যত্যয় ঘটেছে বলে মনে করে সিপিডি।
আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান থাকলেও মব সহিংসতা এবং নারী, শিশু ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। বর্তমান বাস্তবতায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সিপিডি।
সিপিডির পর্যালোচনায় শিল্প খাতের পরিস্থিতিকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে ৬১ হাজার ৮৮১ জন সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে নেমে শূন্যে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে।
এ সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে নেমে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে।
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি জটিলতা, এলএনজি সংগ্রহ এবং কার্গো গ্রহণে সমস্যার কারণে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে সিপিডি।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেলবোর্ড ও সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্পে। শিল্প খাতে গ্যাসের ব্যবহার ১ হাজার ১৮৬ এমএমসি থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ এমএমসিতে নেমেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধিও ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।
মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয় বলে মনে করছে সিপিডি। সংস্থাটির হিসাবে, সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে নেমে ৭ দশমিক ২ শতাংশে এসেছে।
তবে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হলেও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনো নেতিবাচক রয়েছে।
রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। বিপরীতে আমদানি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।
রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে মাসিক গড় বিদেশে কর্মসংস্থান ৯৫ হাজার ৫২১ জন থেকে নেমে ৫১ হাজার ২৩৫ জন হয়েছে।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্য ঘাটতি ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে চলতি হিসাবে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্তের পরিবর্তে ৬০০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে।
সিপিডির মূল্যায়নে সরকারের কয়েকটি পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, অপ্রকাশিত অর্থ বৈধ করার প্রস্তাব বাতিল, ই-রিটার্ন ও ডিজিটাল আয়কর ব্যবস্থার বিস্তার এবং তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্প্রসারণ।
এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ স্বাক্ষর, বিডা-বেজা-পিপিপিএ একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ চালু, স্টার্টআপ ফান্ড গঠন এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মেট্রো ও ট্রেনের ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড়ের উদ্যোগও ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
কৃষিঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ ও সুদ মওকুফ এবং নারী পরিচালিত ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুর উদ্যোগকেও স্বাগত জানিয়েছে সংস্থাটি।
ব্যাংকিং খাতে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন এবং পাঁচটি অকার্যকর এনবিএফআইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬ প্রয়োগকেও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে সিপিডি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা এবং শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা।
অর্থনীতি পুনর্গঠনে অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ সময়ের জন্য একটি ‘কোর বাজেট’ প্রণয়নের সুপারিশ করেছে সিপিডি। পাশাপাশি জ্বালানি, ব্যাংকিং, এনবিআর, রাজস্ব ও সরকারি ব্যয়, এডিপি, লজিস্টিকস, ডিজিটালাইজেশন এবং বেতন কমিশনসহ বিভিন্ন খাতকে অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা এবং জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে।
আগামী সেপ্টেম্বরেই সংসদে বেতন কাঠামো, ব্যাংকিং ও বিদ্যুৎ খাত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনের পরামর্শও দিয়েছে সিপিডি।
একুশে সংবাদ/এ.জে