নরসিংদীতে কুয়েত প্রবাসীর স্ত্রীসহ প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা নগদ এবং ৩৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক এক নেতার বিরুদ্ধে।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে নরসিংদী প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী কুয়েত প্রবাসী মো. লুৎফর রহমান।
অভিযুক্ত ওই নেতার নাম অ্যাডভোকেট মো. নয়ন মোল্লা। তিনি নরসিংদী জেলা ছাত্রদলের সাবেক আইনবিষয়ক সহ-সম্পাদক ও নরসিংদী জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।
এদিকে এ ঘটনায় বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করে ভুক্তভোগী মো. লুৎফর রহমান নরসিংদী মডেল থানা, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা আইনজীবী সমিতি এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ থেকে জানা যায়, প্রবাস থেকে ফিরে জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে কোর্টে মামলা করতে আসেন ভুক্তভোগী লুৎফর রহমান। জনৈক ব্যক্তির সহযোগিতায় মামলা করতে নরসিংদী জজ কোর্টের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) নয়ন মোল্লার কাছে যান।
পরে নয়ন জানান, আপনি যেহেতু পুনরায় প্রবাসে চলে যাবেন সে ক্ষেত্রে মামলাটি তো পরিচালনা করতে পারবেন না। সে জন্য মামলার বাদী আপনার স্ত্রীকে দিতে হবে। পরে স্ত্রীকে বাদী করে নরসিংদী জজ কোর্টে একটি মামলা দায়ের করা হয়। সে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব নেন নয়ন মোল্লা।
এ পরিচয়ের সুবাদে নয়ন মোল্লা তার স্ত্রীকে বিভিন্ন সময় নানা অজুহাতে প্রবাস থেকে পাঠানো টাকা হাতিয়ে নিতে থাকেন। একপর্যায়ে স্ত্রী হাফসা বেগম প্রবাস থেকে লুৎফর রহমানের বিভিন্ন সময় পাঠানো ১ কোটি ১০ লাখ নগদ টাকা এবং ৩৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে নয়ন মোল্লার সঙ্গে সম্প্রতি পালিয়ে যান। ঘটনাটি গত ৩ আগস্ট প্রবাসে থেকে লুৎফর রহমান জানতে পেরে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তাদের দাম্পত্য জীবনে ১১ বছর বয়সী ছেলে ও ৮ মাস বয়সী মেয়ে রয়েছে।
প্রবাসী লুৎফর রহমান অভিযোগ করে আরও বলেন, প্রবাসে থেকে আমার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ১ কোটি ১০ লাখ নগদ টাকা এবং ৩৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার হাতিয়ে নিয়ে এখন উধাও নয়ন মোল্লা। আমি দেশবাসীর কাছে এর ন্যায় বিচার চাই।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত নয়ন মোল্লার মোবাইলে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
নরসিংদী জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান ভূইয়া বলেন, নয়নের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ আমরা পেয়েছি। এ বিষয়ে বারের সাধারণ সম্পাদককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা প্রমাণ হলে নিয়ম অনুসারে তাকে বহিষ্কার করব। আর বার সদস্য থেকে যদি বহিষ্কার হয় তাহলে এপিপি পদ এমনিতেই চলে যাবে।
রংপুর নগরীতে জেলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তারের দাবি করেছে মহানগর পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশের ব্যাখ্যার বিপরীতে কিছু বিষয় নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুর পৌনে ১টার দিকে মহানগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুজন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। তবে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য ও ঘটনাস্থল এবং নিহতদের পরিবারের স্বজনদের বক্তব্য নিয়ে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
পুলিশ কমিশনার জানান, জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ এক মাদক কারবারির কাছ থেকে ইয়াবা কিনে গণপতি চক্রবর্তীর বাসার পাশেই সীমান্ত নামের একজনের বাসার বসে ইয়াবা সেবন করেন। পরে রাতের শেষ দিকে তারা দেবু নামের এক ব্যক্তির নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। সেখানে ইয়াবা সেবনের সময় শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী খালি গায়ে ও গলায় গামছা নিয়ে ছাদে আসেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়াবা সেবনের সময় শব্দ শুনে ছাদে গিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রথমে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। পরে তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকেও হত্যা করা হয়।
সীমান্তের বাসায় ইয়াবা সেবনের পর ওই বাসার ছাদে কেন?
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার বলেন, গ্রেপ্তার দুজন জানিয়েছে তারা ওই রাতে পাশেই সীমান্তের বাড়িতে গিয়ে ইয়াবা সেবন করেছে। পরে শেষ রাতের দিকে দেবু নামের এক ব্যক্তির তিন তলা ভবনের ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে লাফ দিয়ে গিয়ে ইয়াবা সেবন করেন।
এ সময় পুলিশ কমিশনারকে প্রশ্ন করা হয়, অভিযুক্তরা ইয়াবা সেবনের জন্য দেবু নামের ওই ব্যক্তির নির্মাণাধীন তিন তলা ভবনের নির্মানাধীন তিন তলার পুরো ফাকা ‘স্পেস’ ও ছাদ ব্যবহার না করে তারা গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে কেন গেলেন?
এ সময় তিনি বলেন, ‘এত অল্প সময়ে এই হত্যাকান্ড নিয়ে মামলার যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, আমি আলহামদুলিল্লাহ বলব। আমি আপনাদের বলব পুলিশের ভালো কাজগুলোর প্রশংসা করবেন এবং নেগেটিভ কাজের সমালোচনা করবেন। শেষে কথাটা বলব আমার উপর আস্থা রাখতে পারেন।’-এই কথা বলে তিনি ব্রিফিং সমাপ্ত করেন।
ঘুমিয়ে থাকা প্রিয়মকে খুন করতে হলো কেন?
সংবাদ সম্মেলনে মহানগর পুলিশ কমিশনার আব্দুল মাবুদ বলেন, ‘আর এই যে ৪টা খুন হয়েছে, ৪টা খুন একের পর এক হয়েছে। প্রথমে গণপতি চক্রবর্তী স্যারকে খুন করা হয়।স্যারের গোঙানির শব্দ পেয়ে তার ওয়াইফ প্রীতিলতা ম্যাডাম যখন যাচ্ছিলেন, তখন তাকে খুন করা হয়। তার শব্দ পেয়ে মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী যখন আসছিলেন, তখন তাকেও খুন করা হয়। সবশেষে ঘুমিয়ে থাকা নিষ্পাপ শিশুটাকে খুন করা হয়।’
পুলিশের এই বক্তব্যের পরই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে একজন হত্যার সময় অন্য কেউ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পড়লে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রিয়ম তো ঘুমিয়েই ছিল। তাহলে তাকে হত্যার প্রয়োজন কেন মনে করেছিল হত্যাকারীরা?
বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিল কে?:
মাছুয়া পাড়ার যে বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে সেই বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। তবে হত্যাকাণ্ডের আগে নাকি পরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল সে তথ্য এখনো জানা যায়নি।
খবর পেয়ে শনিবার রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ওই বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন দেখতে পান। পরে তারা পুনরায় সংযোগ চালু করে তদন্ত কাজ শুরু করেন। তাহলে প্রশ্ন হল এই বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ কখন করা হয়েছিল এবং কারা করেছিল?
হত্যার আগে বোনকে কল দিয়েছিলেন প্রীতিলতা চক্রবর্তী:
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ছোট বোন পূজা চক্রবর্তীকে হোয়াটসঅ্যাপে কল দেন গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী। কথোপকথন শুরুতে মেয়ে আগামী চক্রবর্তী তার খালার সাথে কথা বলেন। পরে দুই বোনের মধ্যে পাঁচ মিনিটের মতো সময় ধরে কথোপকথন হয়।
পূজা চক্রবর্তী কালবেলাকে বলেন, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে কথা বলার পর তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। পরদিন শুক্রবার দেখেন রাত ২টা ৪০ মিনিটে তার বোন তাকে হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়েছিলেন। কিন্ত মোবাইলের ডাটা কানেকশন বন্ধ করে রাখায় সেই কল তিনি পাননি।পরবর্তীতে কল ব্যাক করলেও তার ফোনে আর কল ঢোকেনি।
হঠাৎ করেই দরজা বন্ধ করে ঘুমাতে শুরু করেছিলেন গণপতি :
গত বছরের ডিসেম্বরে অবসরে যাওয়ার প্রায় দুমাস আগ থেকে হঠাৎ করেই ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমানো শুরু করেন গণপতি চক্রবর্তী। তার সঙ্গে পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া পুত্র প্রিয়ম চক্রবর্তীও ঘুমাতেন।
গণপতি চক্রবর্তী এর স্ত্রীর ছোট বোন ছোটবোন পূজা চক্রবর্তী বলেন, ‘দিদি আমার বাসায় এসে হঠাৎ বলে তোর জামাইবাবু ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমানো শুরু করেছে। তিনি সম্ভবত কোন ভয়ে ছিলেন।’
বাড়ি নির্মাণের সময় পেয়েছিলেন ‘থ্রেট’, মীমাংসা করেছিলেন গণপতি:
রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। এর আগে তিনি স্কুলের পাশে বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।
দুই-তিন বছর আগে নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করতে শুরু করেন। তবে এ সময় কিছু ব্যক্তিদের কাছ থেকে ‘থ্রেট’ পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন গনপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী এর মেয়ের জামাই বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী।
বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী কালবেলাকে বলেন, ‘আমার কাকা শ্বশুর আমাকে বলেছিলেন তাকে নাকি কারা হুমকি দেন। আমি তার কাছে বারবার সেসব ব্যক্তির নাম শুনতে চাইলেও তিনি বলেননি। পরে জানান যে তাদের সাথে মীমাংসা করে ফেলেছেন। তিনি খুবই চাপা স্বভাবের মানুষ ছিলেন।’