২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় সেতু ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনায় যারা আগুন দিয়েছিল, তাদের বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে আগুন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ গতকাল সোমবার প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চতুর্থ দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় শেখ হাসিনার একটি ফাঁস হওয়া অডিও কথোপকথনের লিখিত সংস্করণ তুলে ধরেন।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার টেলিফোন আলাপ সরকারি সংস্থায় রেকর্ড হয়েছিল, যা পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিকে সত্য বলে প্রমাণিত হয়। ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত রেকর্ড অনুযায়ী, তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে আলাপে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
কথোপকথনে আরও উঠে আসে যে, তৎকালীন মন্ত্রী হাছান মাহমুদ এই নির্দেশের জবাবে একে ‘টিট ফর ট্যাট’ বলে মন্তব্য করেছিলেন এবং মহল্লায় মহল্লায় নেতা-কর্মীদের প্রতিরোধের নির্দেশ দেওয়ার কথা বলেছিলেন। অন্যদিকে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ফোনালাপে শেখ হাসিনা র্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে হেলিকপ্টার ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি হামলাকারীদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করে প্রতিহত করার কথা বলেন। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে মোকাবিলা এবং গণমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ আরোপের বিষয়েও বিভিন্ন নির্দেশনা দেন তৎকালীন শীর্ষ নেতারা।
যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আরাফাতের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড পেশ করা হয়। রেকর্ড শুনে বোঝা যায়, জুলাই মাসে আন্দোলন দমনে সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছিল। মোহাম্মদ এ আরাফাত ওবায়দুল কাদেরকে নিশ্চিত করেন যে, সংঘাত বা মারামারির কোনো ভিডিও ফুটেজ বা ছবি প্রচার করলে সংশ্লিষ্ট টিভি চ্যানেলকে ‘এনিমি অব দ্য স্টেট’ (রাষ্ট্রের শত্রু) হিসেবে ঘোষণা করে চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়া দ্রুত কার্যকর করার জন্য বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কর্তৃপক্ষকে বিশেষ ‘ঢালাও পারমিশন’ দেওয়া হয়েছিল, যাতে কোনো উচ্চতর অনুমতি ছাড়াই তারা তাৎক্ষণিকভাবে যেকোনো চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করে দিতে পারে।
ফোনালাপে শোনা যায়–
ওবায়দুল কাদের: এই যে যারা কথা শোনে না, টিভি চ্যানেলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা...
আরাফাত: ওই যে অফ করে দিছি গতকাল দুই-একটা। আজকেও বলে রাখছি যেগুলো শুনবে না অফ করে দিতে সাথে সাথে।
ওবায়দুল কাদের: আজকে যেন কোনো সংঘাতের খবর না দেয়।
আরাফাত: আজকে ওদেরকে বলছি যে, আজকে যদি কোনো সংঘর্ষের-মারামারির ভিডিও ফুটেজ বা লাশের ছবি দেখায়, ওদের এনিমি অব দ্য স্টেট হিসেবে ডিক্লেয়ার করা হবে এবং সারা জীবনের জন্য বন্ধ করে দেব। আর ওই যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে বসায়ে রাখছি যে, আপনি কন্সট্যান্টলি দেখবেন যে, টিভি সংঘর্ষের ছবি দেখাবে সাথে সাথে অফ করে দেবেন। আমার কোনো পারমিশনের জন্য মেসেজ পাঠাবেন না আপনাকে ঢালাও পারমিশন দিয়ে রাখলাম আর উইদাউট মাই পারমিশন এটা অন করবেন না, আর এই ব্যবস্থা নিয়ে রাখছি কাদের ভাই।
এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।