জুলাই জাদুঘরের ভাস্কর্যের মুখাবয়ব মুছে ফেলার আহ্বান মামুনুলের

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাদুঘরে থাকা মানুষের ভাস্কর্যগুলোর মুখাবয়ব মুছে ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক।

আজ রোববার জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ আহ্বান জানান বলে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস।

জাদুঘরে থাকা ভাস্কর্য প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, ফ্যাসিবাদের সময়ে ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলনও একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন ছিল। আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল—রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় মুসলিম সংস্কৃতি ও মূল্যবোধবিরোধী মানুষের ভাস্কর্য থাকতে পারে না।

‘সে জায়গা থেকে শাপলা চত্বরের শহীদদের মুখাবয়ব বাদ দিয়ে তাদের স্মৃতি ও ঘটনাকে চিত্রিত করার পরামর্শ দিচ্ছি’, বলেন তিনি।

জাদুঘরের সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানান খেলাফত মজলিসের আমির।

তিনি বলেন, সেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ও স্মৃতিচিহ্ন অত্যন্ত মামুলিভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে এবং মূল্যবান অনেক জিনিস মানুষের হাতের নাগালে রয়েছে। এগুলো প্রদর্শনের পাশাপাশি সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে।

মামুনুল হক বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি। ২০১৩ সালে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর সারা দেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, ২০১৫-১৬ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাড়ির সামনে বালুর ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ করার পরের আন্দোলন এবং ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিও যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।

১৯৭১ সালের পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার স্মৃতি যেভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, একইভাবে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড ও মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিও সংরক্ষণ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ফেলানী হত্যার স্মৃতি জাদুঘরে না থাকার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন মামুনুল হক।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফেলানীর ঝুলন্ত মরদেহের ছবির চেয়ে বড় ফ্যাসিবাদী নির্যাতনের ছবি বাংলাদেশের সামনে আসেনি। ওই দৃশ্য পুরো বাংলাদেশকে তুলে ধরেছিল। সেটি জাদুঘরে স্থান না পাওয়ায় জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে।

জুলাই ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের অংশীজনদের স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও বৈষম্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

যার যতটুকু ভূমিকা, সেভাবেই স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মামুনুল হক বলেন, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে এ ধরনের বৈষম্য কোনোভাবেই সমীচীন নয়।

সম্পর্কে ‘নতুন সূচনা’ চায় ঢাকা ও নয়াদিল্লি

ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘নতুন সূচনার’ ওপর গুরুত্বারোপ করেছে বাংলাদেশ ও ভারত। এর মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী তিক্ততা কাটিয়ে সমতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও আলোচনার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন করে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার আভাস মিলেছে এই পদক্ষেপে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পরদিন অর্থাৎ গতকাল সোমবার ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকেই মূলত ওই বার্তাটি দেওয়া হয়।

ত্রিবেদী প্রথমে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। গত ১২ জুন ঢাকায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এটিই ছিল তার প্রথম সাক্ষাৎ।

গতকাল বিকেলেই ত্রিবেদী দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা, ঢাকায় হওয়া আলোচনার বিষয়গুলো জানাতেই তার এই ঝটিকা সফর। বিশেষ করে, গত ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত ও দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে যে বক্তব্য দেন, সেটি  নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতি এর অন্যতম কারণ।

ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্য ঢাকা একেবারেই ভালোভাবে নেয়নি এবং তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। অথচ এ বিষয়ে ঢাকার আপত্তির কথা আগেই দিল্লিকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছিল।

তারেক রহমানের সঙ্গে ত্রিবেদীর সাক্ষাতের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে খলিলুর রহমান বলেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ বিচার বিভাগের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছেন। আর ভারত সরকারও তাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আশা করব আমাদের রাষ্ট্রের কোনো স্তম্ভকে খাটো করার কিছু তারা আর করবে না। তাদের সঙ্গে আমার যা কথা হয়েছে আমি কিছুটা হলেও আশ্বস্ত, এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। সেই থেকেই ‘হাসিনা ইস্যুটি’ দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।

খলিলুর রহমান জানান, শেখ হাসিনা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার আসামিদের দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়ার (প্রত্যর্পণ) জন্য দিল্লিকে অনুরোধ করেছে ঢাকা।

তিনি বলেন, হাদির সন্দেহভাজন খুনিদের বিষয়ে ভারত যেসব নথিপত্র চেয়েছিল, বাংলাদেশ তা এরইমধ্যে সরবরাহ করেছে।

খলিলুর রহমান আরও বলেন, এটি আমাদের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। আমরা অনুরোধ করেছি যেন এই খুনিদের যত দ্রুত সম্ভব আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

তবে ভারতীয় হাইকমিশনার ত্রিবেদী জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় আইনি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই ভারত এই প্রত্যর্পণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

এ ছাড়া সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন (অনুপ্রবেশ), পানিবণ্টন এবং বাণিজ্য সংক্রান্ত বিধিনিষেধ—যেসব সমস্যা দুই দেশের মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে—সেগুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

খলিলুর রহমান জানান, তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতে এই বিষয়গুলো নিয়ে খুব সংক্ষেপে কথা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ত্রিবেদী সাক্ষাৎ করে যাওয়ার পর এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটসহ নানা দিক থেকে বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে সুদৃঢ় করতে একটি নতুন সূচনা বা ফ্রেশ স্টার্ট জরুরি।

তিনি উল্লেখ করেন, বিদ্যমান মতভেদগুলো আলোচনা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব, তবে এ ক্ষেত্রে ভারতকে আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে সমতার ভিত্তিতে।

অন্যদিকে, ভারতীয় হাইকমিশনার ত্রিবেদীও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ থাকার বিষয়টিকে তিনি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির একটি স্বাভাবিক অংশ এবং ‘গণতন্ত্রের সৌন্দর্য’ হিসেবে অভিহিত করেন।

তিনি বলেন, এ ধরনের মতভেদ ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না। দুই দেশের মানুষই এমন একটি শক্তিশালী সম্পর্ক চায় যা উভয় পক্ষের জন্যই কল্যাণকর হবে।

ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ত্রিবেদী তারেক রহমানের কাছে একটি ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

ত্রিবেদী বলেন, খুব ভালো আলোচনা হয়েছে। আমাদের যেমন কিছু অমীমাংসিত বিষয় আছে, তেমনি বাংলাদেশেরও আছে। কিন্তু দিনশেষে জনগণের কাছে একটিই বড় বিষয়, আর তা হলো—সুসম্পর্ক। এমন কোনো সমস্যা নেই যা আমরা একসঙ্গে বসে সমাধান করতে পারি না।

তিনি জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।

ত্রিবেদী তারেক রহমানকে অত্যন্ত বিনয়ী ও ‘মাটির মানুষ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তাকে দেখে মনেই হয়নি যে আমি তার সঙ্গে প্রথমবার দেখা করছি। তিনি খুব ভালো একজন মানুষ, অত্যন্ত বিনয়ী এবং সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকেন। আমাদের আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে এবং আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছি।

এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেক চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান যোগ দেবেন কি না, বা তিনি ভারত সফর করবেন কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, আমন্ত্রণটি ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আসেনি, বরং বিমসটেকের চেয়ারম্যানের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে। এই পার্থক্যটা আপনারা বোঝার চেষ্টা করবেন।

একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, তারেক রহমান যদি সম্মেলনে যোগ না দেন, তবে সম্মেলনের কাছাকাছি সময়ে ঢাকা তার জন্য দিল্লিতে আলাদা একটি সফরের আয়োজন করার চেষ্টা করতে পারে।

ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান ইতিবাচক আমেজের প্রেক্ষাপটে তারা এখন প্রস্তুত। তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের বিষয়ে উভয় পক্ষ থেকে একটি ইতিবাচক সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছে তারা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের সফরের জন্য উভয় দেশেরই ব্যাপক প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। যেহেতু এখানে অনেক মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন খাত জড়িত, তাই আমাদের এমনভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে যেন সেই সফর থেকে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর কোনো ফলাফল পাওয়া যায়।
 

১৬ বছর ধরে নিষ্ক্রিয় পপুলেশন কাউন্সিল, বাড়ছে প্রজনন হার

তুহিন শুভ্র অধিকারী

বাংলাদেশের জনসংখ্যা নীতি ঠিক করা, এর বাস্তবায়ন দেখভাল করা এবং প্রয়োজন হলে নীতিতে পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্ব ন্যাশনাল পপুলেশন কাউন্সিলের (এনপিসি)। কিন্তু সেই কাউন্সিলই গত ১৬ বছর ধরে কার্যত নিষ্ক্রিয়। সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে। এর মধ্যে দেশে দুটি নতুন জনসংখ্যা নীতি হয়েছে, অথচ কাউন্সিলের একটি বৈঠকও হয়নি। কাউন্সিলটি এমন একটা সময়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে, যখন বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ দশকের মধ্যে প্রথমবার মোট প্রজনন হার (টিএফআর) বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, প্রজনন হার বাড়লে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য বাড়তে পারে, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য এবং অপুষ্টির পরিস্থিতিও খারাপ হতে পারে।

কাউন্সিলটি নিষ্ক্রিয় থাকায় এর দুটি বাস্তবায়নকারী সংস্থাও কার্যত অচল হয়ে আছে। এর একটি হলো স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন নির্বাহী কমিটি। অন্যটি স্বাস্থ্যসচিবের নেতৃত্বাধীন একটি টাস্কফোর্স।

এই সময়ে বাংলাদেশ দুটি জাতীয় জনসংখ্যা নীতি গ্রহণ করেছে, ২০১২ সালে একটি এবং ২০২৫ সালে আরেকটি। কিন্তু এই দুই নীতি গ্রহণের সময় কাউন্সিলের একটিও বৈঠক হয়নি। অথচ পপুলেশন কাউন্সিলের দায়িত্বই হলো নীতি বাস্তবায়নে দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে নীতিতে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া।

এদিকে সর্বশেষ জনসংখ্যা নীতিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাউন্সিলের সচিবালয় হিসেবে কাজ করবে এবং বছরে অন্তত একবার কাউন্সিলের বৈঠকের আয়োজন করবে।

২০২৫ সালের এপ্রিলে ন্যাশনাল পপুলেশন কাউন্সিল নতুন করে গঠন করা হয়। তখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে কাউন্সিলের চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। 

তবে নতুন করে গঠনের পরও এখন পর্যন্ত কাউন্সিলের কোনো বৈঠক হয়নি। কাউন্সিল পুনর্গঠনের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, বছরে অন্তত দুবার এর বৈঠক করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক আমিনুল হক বলেন, আমাদের জাতীয় পরিকল্পনার সব ক্ষেত্রেই জনসংখ্যাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কাউন্সিলটি নিষ্ক্রিয় থাকায় বোঝা যায়, জনসংখ্যাকে যে গুরুত্ব দেওয়া দরকার ছিল, আমরা তা দিতে পারিনি।

তার মতে, শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর না দিয়ে জনসংখ্যা কীভাবে ভালোভাবে পরিচালনা করা যায় এবং দেশের মানুষের কাছ থেকে কীভাবে সর্বোচ্চ উৎপাদন পাওয়া যায়, সেদিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে শক্তিশালী নীতি নেওয়া যেত।

তিনি বলেন, এ ধরনের কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেওয়ার কাজ করতে পারত কাউন্সিলটি। কিন্তু সেটাই অনুপস্থিত ছিল। এর ফলে জনসংখ্যা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের গুরুত্ব পায়নি এবং বড় কোনো জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবেও সামনে আসেনি।

আমিনুল হক পুনর্গঠিত পপুলেশন কাউন্সিলেরও একজন সদস্য। তিনি বলেন, সমস্যা শুধু জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে না পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আরও বড় সমস্যা হলো, জনসংখ্যা কীভাবে ভালোভাবে পরিচালনা করা যায়, মানুষকে কীভাবে উৎপাদনশীল জনশক্তিতে পরিণত করা যায় এবং এই সম্ভাবনাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, এসব নিয়ে আমরা সমন্বিত জনসংখ্যাকেন্দ্রিক নীতি নিতে পারিনি।

জনসংখ্যার বিষয়টিকে দীর্ঘদিন গুরুত্ব না দেওয়ার দৃশ্যমান ফল হলো দেশে মোট প্রজনন হার বেড়ে যাওয়া।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের সর্বশেষ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভেতে (এমআইসিএস) ২০২৫ দেখা গেছে, ২০২৫ সালে দেশে প্রতি নারীর গড় সন্তানসংখ্যা বা মোট প্রজনন হার বেড়ে ২ দশমিক ৪ হয়েছে। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ২ দশমিক ৩।

দক্ষিণ এশিয়ায় এখন বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে প্রজনন হার কমার বদলে বাড়ছে। এর ফলে এমনিতেই ঘনবসতি, খাদ্যনিরাপত্তার সংকট এবং চাপের মুখে থাকা স্বাস্থ্যসেবার ওপর আরও চাপ তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালে একজন নারীর গড়ে সন্তানসংখ্যা ছিল ৬ দশমিক ৩। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির বড় ভূমিকার কারণে এই হার ২০১২ সালে কমে ২ দশমিক ৩-এ নেমে আসে।

এরপর এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রজনন হার প্রায় একই জায়গায় ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের জরিপে তা বেড়ে ২ দশমিক ৪ হয়েছে। কয়েক দশকের মধ্যে এটাই প্রথমবার প্রজনন হার বাড়ার ঘটনা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জনসংখ্যা নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং কয়েক দশক ধরে প্রজনন হার কমে আসার পর এক ধরনের আত্মতুষ্টি অন্যতম কারণ।

আমিনুল হক বলেন, এত দীর্ঘ সময় পপুলেশন কাউন্সিলের কোনো বৈঠক না হওয়াও আগের সরকারের জনসংখ্যা নীতির প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে।

অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের এপ্রিলে চার দশকের পুরোনো ন্যাশনাল পপুলেশন কাউন্সিল পুনর্গঠন করে। এরপর তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম গত বছরের জুনে জনসংখ্যা-সংক্রান্ত একটি বৈঠক করেছিলেন। তবে সেটি পপুলেশন কাউন্সিলের বৈঠক ছিল না। কাউন্সিল নিজে এখনো কোনো বৈঠক করেনি। দীর্ঘ ১৪ বছর পর ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে কাউন্সিলের সর্বশেষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ ২০১২ সালে দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ জনসংখ্যা নীতি গ্রহণ করে। ওই নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ২০১৫ সালের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনার উপকরণ ব্যবহারের হার বাড়িয়ে ৭২ শতাংশে নেওয়া এবং মোট প্রজনন হার কমিয়ে ২ দশমিক ১-এ আনা। কিন্তু এই দুটি লক্ষ্যের কোনোটিই পূরণ হয়নি।

২০২৫ সালের এমআইসিএস অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনার উপকরণ ব্যবহারের হার ২০১৯ সালের ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। ২০১৯ সালে এটিই ছিল দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ হার। ২০১২-১৩ সালে এই হার ছিল ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ গত বছরের জুলাইয়ে তৃতীয় জাতীয় জনসংখ্যা নীতি গ্রহণ করে। এই নীতিতে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দেশের জনমিতিক সুবিধাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো।

নীতিতে বলা হয়েছে, জনসংখ্যা নীতি বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় এবং নজরদারি করবে ন্যাশনাল পপুলেশন কাউন্সিল।

কাউন্সিল নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে দিকনির্দেশনা দেবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করবে। নীতির বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে। এর প্রভাব মূল্যায়ন করবে। প্রয়োজনে নীতিতে পরিবর্তন বা সংশোধনের সুপারিশ করবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি নির্বাহী কমিটি থাকবে। এই কমিটি পপুলেশন কাউন্সিলের নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পৌঁছে দেবে। একই সঙ্গে এসব নির্দেশনা কীভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে, সেটিও দেখবে কমিটি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চিকিৎসা শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ কাউন্সিলের সচিবালয় হিসেবে কাজ করবে। এই বিভাগ নিয়মিত, অর্থাৎ বছরে অন্তত একবার কাউন্সিলের বৈঠক আয়োজন করবে।

বিভাগটির সচিবের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্সও থাকবে। এতে জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি থাকবেন। এই টাস্কফোর্স সচিবালয়কে কারিগরি নীতির বিভিন্ন নথি তৈরিতে সহায়তা করবে।

এ ছাড়া কাউন্সিলের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করবে এবং এ-সংক্রান্ত অন্যান্য কাজও করবে।

যোগাযোগ করা হলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জিন্নাত রেহানা বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ন্যাশনাল পপুলেশন কাউন্সিল পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করতে বলেছে তাদের।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টাকে চেয়ারম্যান করে যে কাউন্সিল পুনর্গঠন করা হয়েছিল, সেটি আবারও পুনর্গঠন করতে হবে। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ইতোমধ্যে সেই কাজ শুরু হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কাউন্সিল পুনর্গঠনের পর পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর পরিষদের বৈঠক আয়োজনের প্রক্রিয়া শুরু করবে।