সন্তানদের সামনে স্ত্রীকে মারধর, স্বামীর ঠাঁই হলো বাংলাদেশে
ইতালিতে গর্ভবতী স্ত্রীর ওপর দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত এক প্রবাসী বাংলাদেশিকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
ইতালির গোরিৎসিয়া প্রদেশের মনফালকোন শহর থেকে ওই প্রবাসীকে গ্রেফতার ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে ভেনিস বিমানবন্দর দিয়ে একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বহিষ্কৃত ব্যক্তির নাম মাসুম মিয়া (৫৫)। তার বাড়ি বাংলাদেশের নরসিংদী জেলার বেলাবো থানার চল্লাবাজ এলাকায়। তিনি গত ১৫ বছর ধরে ইতালির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মনফালকোন এলাকার একটি শিপইয়ার্ডে কাজ করছিলেন।
যে কারণে অভিবাসীর ঢল নেমেছে সেউতায়
তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, মাসুম মিয়া তার স্ত্রীর ওপর দীর্ঘদিন ধরে চরম পারিবারিক সহিংসতা চালিয়ে আসছিলেন। স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা থাকা সত্ত্বেও সন্তানদের সামনেই তাকে নিয়মিত লাথি, চড় ও ঘুষিসহ নানাভাবে মারধর করা হতো। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার পর গোরিৎসিয়া আদালত তাকে ৩ বছর ৬ মাসের কারাদণ্ড দেন। পরবর্তীতে ত্রিয়েস্তে আপিল আদালতও এই সাজা বহাল রাখেন।
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
আদালতের চূড়ান্ত রায়ের পর গোরিৎসিয়ার প্রিফেক্ট (প্রশাসনিক প্রধান) ওই ব্যক্তির অবস্থান জননিরাপত্তার জন্য হুমকি বিবেচনা করে তাকে অবিলম্বে ইতালির ভূখণ্ড থেকে ডিপোর্ট বা বহিষ্কারের নির্দেশ দেন। নির্দেশের পরপরই ইতালীয় রাষ্ট্রীয় পুলিশ তাকে সরাসরি বিমানবন্দরে নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়।
এদিকে ভুক্তভোগী নারী ও তার সন্তানদের সুরক্ষার স্বার্থে ইতালীয় পুলিশ তাদের দায়িত্ব নিয়ে স্থানীয় একটি সামাজিক ‘অ্যান্টি-ভায়োলেন্স সেন্টারে’ (সহিংসতাবিরোধী আশ্রয়কেন্দ্র) পাঠিয়েছে, যেখানে তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ইতালির আইন ও বিচার ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগের বিষয়টি উল্লেখ করে স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা জানিয়েছেন, পারিবারিক সহিংসতা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়ে দেশটি জিরো-টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে।
এমআরএম
বিজ্ঞাপন
যে কারণে অভিবাসীর ঢল নেমেছে সেউতায়
মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সাঁতরে ও স্থলপথে স্পেনের আফ্রিকাভিত্তিক ছিটমহল ‘সেউতা’য় প্রবেশ করেছেন প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। নজিরবিহীন এই অভিবাসী ঢলের পর ইউরোপের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একাধিক ডানপন্থি নেতা দাবি করছেন- স্পেন সরকারের সাম্প্রতিক অভিবাসী ‘নিয়মিতকরণ’ (রেগুলারাইজেশন) কর্মসূচির কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে তথ্যানুসন্ধান ও বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নিয়মিতকরণ নীতি নয়, বরং ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন ও আদালতের আইনি আদেশই এই সংকটের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
ইতালির কট্টর ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তায়ানি অভিযোগ করেছেন, স্পেনের বিশেষ এই অভিবাসী নীতি মানবপাচারকে উৎসাহিত করছে। তায়ানি এটিকে ‘ইউরোপীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার ভুল সিদ্ধান্ত’ বলে আখ্যা দেন। একই সুর দেখা গেছে ফরাসী এমপিদের কণ্ঠেও।
আবেদন প্রক্রিয়া বন্ধ: স্পেন সরকারের এই কর্মসূচির আবেদন গ্রহণ জুনের শেষেই শেষ হয়েছে- অর্থাৎ এই ঘটনা ঘটার অন্তত এক মাস আগে। নতুনদের জন্য এই সুযোগে আবেদনের কোনো সুযোগ নেই।
নাগরিকত্ব নয়, কেবল রেসিডেন্স পারমিট: কর্মসূচির আওতায় কোনো নাগরিকত্ব দেওয়া হচ্ছে না, বরং শর্তপূরণ সাপেক্ষে এক বছরের জন্য নবায়নযোগ্য বসবাসের অনুমতি (রেসিডেন্স পারমিট) দেওয়া হচ্ছে।
মরক্কোর অভিবাসীদের অংশগ্রহণ কম: মোট ১২ লাখ আবেদনকারীর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ (প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ) মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার নাগরিক। মরক্কোর নাগরিকদের আবেদন মোট আবেদনের মাত্র ১৩ শতাংশ।
স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে মানুয়েল আলবারেস ইইউ নেতাদের এই বক্তব্যকে খণ্ডন করে বলেন, এটি ‘প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, বরং দলীয় রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর।’
মরক্কো সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য না দিলেও পর্যবেক্ষক ও নীতি-নির্ধারকেরা সেউটায় হঠাৎ অভিবাসী ঢলের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের রায় ও আইনি জটিলতা: জুনের শেষে স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, সমুদ্র থেকে অভিবাসীদের আটক করে কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই মরক্কোয় তাৎক্ষণিক ফেরত পাঠানো (‘পুশব্যাক’) বেআইনি। স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের মতে, আদালতের এই রায়ের ফলে সীমান্তে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে এক ধরনের শিথিলতা তৈরি হয়।
আলজেরিয়া সফর ও ভূরাজনৈতিক উত্তাপ: গত ২০ জুলাই স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আলজেরিয়া সফর করেন। পশ্চিম সাহারা অঞ্চল নিয়ে আলজেরিয়ার সঙ্গে মরক্কোর দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বে সানচেজের এই সফর রাবাতকে (মরক্কো সরকার) ক্ষুব্ধ করে থাকতে পারে। ২০২১ সালেও কূটনৈতিক বিরোধের জের ধরে মরক্কো সীমান্তে কঠোরতা শিথিল করেছিল, যার ফলে দুই দিনে ১০ হাজার অভিবাসী সেউটায় ঢুকে পড়েছিলেন।
‘সিংহাসন দিবস’ ও গুজব: গত বৃহস্পতিবার মরক্কোর ‘সিংহাসন দিবস’ উপলক্ষে সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তার ধরন পরিবর্তিত হয়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে’ বলে গুজব ছড়িয়ে পড়লে বিপুলসংখ্যক মানুষ সীমান্তে জড়ো হন।
স্পেনের নিয়মিতকরণ পরিকল্পনার কঠোর সমালোচনা করলেও ইতালির নিজস্ব অভিবাসন নীতিতে স্ববিরোধী চিত্র দেখা গেছে। ফ্রান্স ভিত্তিক সংস্থাসমূহের তথ্যমতে, তীব্র শ্রমিক সংকট কাটাতে ইতালি সরকার নিজেই ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কোটা কাঠামোর অধীনে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার নতুন রেসিডেন্স পারমিট ইস্যুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বর্তমানে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী সীমান্ত এলাকায় জলকামান ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রবেশকারীদের মধ্যে ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং প্রতি মিনিটে গড়ে ১৫০ জন করে ফেরত যাচ্ছেন।
সূত্র: ইনফোমাইগ্রেন্টস
এমআরএম
সুইডেনের স্মৃতির জানালায় বাল্যবন্ধুরা
কী আশ্চর্য! কখনো কখনো স্মৃতির জানালাটি হঠাৎ করেই খুলে যায়। তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছোটবেলার সেই দিনগুলো, সেই দুষ্টু আর মিষ্টি বন্ধুদের মুখ, সেই নির্ভেজাল হাসি, সেই অভিমান, সেই ভালোবাসা। মনে হয়, সময় যেন কোথাও থেমে আছে। শুধু আমরাই বয়সের ভার কাঁধে নিয়ে অনেক দূরে চলে এসেছি।
আজ বহু বছর ধরে আমি সুইডেনে। জীবনের পথচলায় নানা দেশের, নানা ভাষার, নানা সংস্কৃতির, নানা বর্ণের, নানা বয়সের অসংখ্য মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। অনেকেই বন্ধু হয়েছে, কেউ সহযাত্রী, কেউ আবার জীবনের বিশেষ অধ্যায়ের অংশ। তবু হৃদয়ের গভীরে যে শূন্যস্থানটি রয়ে গেছে, সেখানে এখনো বসে আছে শৈশবের সেই বন্ধুরাই। কারণ নতুন বন্ধুত্ব জীবনের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, কিন্তু শৈশবের বন্ধুত্ব আত্মার ইতিহাস হয়ে থাকে।
মনে পড়ে, আমাদের ছোটবেলায় কফি হাউস ছিল না, আধুনিক ক্যাফেও ছিল না। আমাদের আড্ডা বসত খেলার মাঠে, স্কুলের মাঠে, নদীর ঘাটে কিংবা ছাত্রাবাসের বারান্দায়। সেখানে ছিল না কোনো বিলাসিতা, ছিল না মোবাইল ফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ছিল শুধু সময়, আন্তরিকতা আর একে অপরের প্রতি নিঃস্বার্থ টান। সূর্য ডুবে যেত, সন্ধ্যা নামত, তবু গল্প শেষ হতো না। সেই দিনগুলোই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ, অথচ তখন আমরা তার মূল্য বুঝিনি।
জীবনের প্রয়োজনে গ্রাম ছেড়েছি, শহরে এসেছি। শহর ছেড়ে একদিন পাড়ি জমিয়েছি বিদেশে। জীবনযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য নয়, নিজের স্বপ্নকে জয় করার জন্য, বাঁচার মতো করে বাঁচার জন্য। কত বছর পেরিয়ে গেছে, কত মানুষ এসেছে-গেছে, কত সম্পর্কের রং বদলেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, শৈশবের বন্ধুরা কখনো স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়নি। তাদের আমি মনের মন্দিরে অত্যন্ত যত্নে রেখে দিয়েছি। এ এক অদৃশ্য সম্পদ, যার মূল্য কোনো মুদ্রায় মাপা যায় না।
তারপর এলো ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন পৃথিবী। হঠাৎ একদিন একটি ছোট্ট ফেসবুক পোস্ট যেন প্রায় চল্লিশ বছরের দূরত্ব মুহূর্তেই মুছে দিল। একে একে খুঁজে পেলাম হারিয়ে যাওয়া অনেক বন্ধু। ফোন বেজে উঠল। ওপাশ থেকে পরিচিত অথচ বহুদিনের বিস্মৃত কণ্ঠস্বর। মনে হলো, সময় যেন একটুও এগোয়নি। গ্রুপ কলে সবাই একসঙ্গে কথা বলছি, হাসছি, পুরোনো দিনের গল্প করছি। মনে হচ্ছিল, আমরা আবার সেই স্কুলের মাঠে ফিরে গেছি। প্রযুক্তি সেদিন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না, ছিল স্মৃতিকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলার এক অপূর্ব সেতুবন্ধন।
কিন্তু সময়ের নিজস্ব নিয়ম আছে। আজ সেই ফোনগুলো আগের মতো আর বাজে না। গ্রুপগুলো নীরব হয়ে গেছে। অনেকেই ব্যস্ত জীবনের ঘূর্ণাবর্তে হারিয়ে গেছে। কেউ সংসারের দায়িত্বে, কেউ কর্মজীবনের চাপে, কেউ অসুস্থতার সঙ্গে লড়ছে, কেউ পৃথিবী থেকেই বিদায় নিয়েছে। আবার কেউ হয়তো সাফল্যের উচ্চ শিখরে পৌঁছে অতীতকে স্পর্শ করার অবসর খুঁজে পায় না। তবু আমি বিশ্বাস করতে চাই, মানুষ তার শৈশবকে কখনো ভুলে যায় না। হয়তো স্মৃতির দরজায় কড়া নাড়ার মতো একটি মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকে।
জীবন আমাদের অনেক কিছু দেয়, আবার অনেক কিছু কেড়েও নেয়। কিন্তু কিছু সম্পর্ক সময়ের হিসাব মানে না। শৈশবের বন্ধুত্ব ঠিক তেমনই। বছর, দেশ, ভাষা কিংবা দূরত্ব তাকে মুছে দিতে পারে না। কারণ সেই সম্পর্কের ভিত্তি ছিল স্বার্থ নয়, ছিল সরলতা; ছিল অর্জন নয়, ছিল একসঙ্গে বড় হয়ে ওঠার গল্প।
আজ সুইডেনের আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে যখন বাংলাদেশের সেই সবুজ গ্রাম, স্কুলের মাঠ, নদীর ঘাট আর শৈশবের বন্ধুদের কথা মনে পড়ে, তখন মনে হয়, মানুষ আসলে দুটি দেশে বাস করে। একটি তার বর্তমানের দেশ, আরেকটি তার স্মৃতির দেশ। বর্তমানের দেশে আমরা জীবন গড়ি, কিন্তু স্মৃতির দেশে আমরা বারবার ফিরে যাই নিজের সত্যিকারের পরিচয় খুঁজে পেতে।
যদি এই লেখাটি পড়ে কোনো এক বাল্যবন্ধুর মনে আরেকজন বাল্যবন্ধুর কথা জেগে ওঠে, যদি কেউ বহুদিন পর একটি ফোন করে শুধু বলে, “কেমন আছিস?”, তাহলেই এই স্মৃতিচারণের সার্থকতা। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়তো অর্থ, ক্ষমতা বা খ্যাতি নয়, বরং এমন কিছু মানুষ, যাদের সঙ্গে কাটানো শৈশব আজও হৃদয়ের ভেতর লতার মতো জড়িয়ে আছে, নীরবে, গভীরভাবে, আজীবন।
কিন্তু এই কথাগুলো লিখতে লিখতেই মনে আরেকটি প্রশ্ন জেগে ওঠে। কেন এমন হয় যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সম্পর্ক শুধু দূরে সরে যায় না, কখনো কখনো যেন আমাদের ভেতর থেকেই হারিয়ে যেতে শুরু করে? হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই পরের কথাগুলো বলা।
হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সময় নয়, দূরত্বও নয়; সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো মানুষের ভেতরে অদৃশ্য প্রাচীরের জন্ম নেওয়া। সেই প্রাচীর কখনো অর্থের, কখনো সামাজিক মর্যাদার, কখনো ব্যস্ততার, আবার কখনো অহংকারের। ধনী-গরিবের পার্থক্য তখন শুধু জীবনযাপনে সীমাবদ্ধ থাকে না, সম্পর্কের মধ্যেও নীরবে জায়গা করে নেয়। একসময় যে বন্ধু একই মাঠে খালি পায়ে দৌড়েছে, একই বেঞ্চে বসে পড়েছে, একই নদীতে ঝাঁপ দিয়েছে, বড় হয়ে সে-ই হয়তো আর ফোন করার সাহস পায় না, কিংবা সময় বের করতে পারে না। অন্যজনও সংকোচে চুপ করে থাকে। এভাবেই নীরবে বন্ধ হয়ে যায় স্মৃতির জানালা।
আমি বিশ্বাস করি, বিশেষ করে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের মানুষের জন্য এই স্মৃতির সেতুবন্ধন কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক শক্তি। কারণ শৈশবের বন্ধুত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার ব্যাংক হিসাব, বাড়ি, গাড়ি কিংবা পদবি নয়; তার পরিচয় সেই মানুষটি, যে একদিন কোনো স্বার্থ ছাড়াই আরেকজনের পাশে দাঁড়িয়েছিল। যদি আমরা সেই সম্পর্কগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, তাহলে হয়তো অর্থের মোহ, সামাজিক প্রতিযোগিতা কিংবা কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার আমাদের পুরোপুরি গ্রাস করতে পারবে না।
বন্ধুর খোঁজ নেওয়া মানে শুধু একটি ফোন করা নয়; নিজের ভেতরের মানুষটিকে জাগিয়ে তোলা। স্মৃতির জানালা খুলে দেওয়া মানে শুধু অতীতকে মনে করা নয়; নিজের শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া। যে মানুষ তার শৈশবকে ভুলে যায়, সে ধীরে ধীরে নিজেরই একটি অংশ হারিয়ে ফেলে। আর যে মানুষ শৈশবের বন্ধুদের ধরে রাখে, সে শুধু সম্পর্কই রক্ষা করে না, নিজের মানবিকতাকেও বাঁচিয়ে রাখে।
হয়তো আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই ছোট্ট সাহসটুকু, বহুদিন পর কোনো এক বাল্যবন্ধুকে ফোন করে শুধু বলা, “বন্ধু, কেমন আছিস?” অনেক সময় এই একটি বাক্যই ভেঙে দিতে পারে বছরের পর বছর জমে থাকা নীরবতার দেয়াল, মুছে দিতে পারে ধনী-গরিবের দূরত্ব, আর আবারও জ্বালিয়ে দিতে পারে সেই আলো, যেখান থেকে একদিন আমাদের বন্ধুত্বের যাত্রা শুরু হয়েছিল।
জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে মানুষ তার সম্পদের হিসাব নয়, খুঁজে ফেরে সেই মানুষগুলোকেই, যারা তার শৈশবের আকাশে প্রথম বন্ধুত্বের ঘুড়ি উড়িয়েছিল।
রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক
সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
এমআরএম
মালদ্বীপ বিএনপির উদ্যোগে এমপি এম. এ. হান্নানকে সংবর্ধনা
মালদ্বীপ বিএনপির উদ্যোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও নাসিরনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম. এ. হান্নান-কে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাজধানী মালের ভিলা কলেজে অনুষ্ঠিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মালদ্বীপ বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ খলিলুর রহমান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এম. এ. হান্নান প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান ও মালদ্বীপ বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন। তিনি আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মালদ্বীপে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের কল্যাণে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। পরে তাকে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মালদ্বীপ বিএনপির সহ-সভাপতি মো. মোহাম্মদ হোসেন, মো. ইলিয়াস মিয়া, মো. শাহ আলম, মো. ফারুক হোসেন, মো. এরশাদ মোল্লা ও মো. বাবুল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মো. জহিরুল ইসলাম এবং সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. শরিফুল ইসলাম।
এ সময় মালদ্বীপ বিএনপির সিনিয়র নেতা, বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা প্রবাসে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা, প্রবাসীদের অধিকার রক্ষা এবং দেশের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন নাসিরনগর উপজেলা যুবদল নেতা মো. আলী ফরহাদ। অনুষ্ঠানটি উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়।
এমআরএম
কুয়েতে প্রবাসীদের টাকা নিয়ে উধাও ‘ইয়েপবিট’ ও ‘বনচ্যাট’
কুয়েতে বাংলাদেশসহ একাধিক দেশের হাজারো প্রবাসী একটি ইন্টারনেটভিত্তিক অ্যাপে বিনিয়োগ করে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ‘ইয়েপবিট’ নামের একটি ডিজিটাল অ্যাপ এবং এর সহযোগী ‘বনচ্যাট’ বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের পর কার্যক্রম বন্ধ করে উধাও হয়ে গেছে চক্রটি।
গচ্ছিত টাকা ফেরত না পেয়ে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন প্রবাসীরা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ফিলিপাইনের প্রবাসীদের লক্ষ্য করে প্রতারণার এই জাল বিছানো হয়েছিল।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীরা জানান, অ্যাপটিতে যুক্ত হতে প্রত্যেককে অন্তত ১৫০০ মার্কিন ডলার বা তার বেশি বিনিয়োগ করতে হতো। টাকা জমা দেওয়ার পর প্রতিদিন সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট সময়ে গ্রাহকদের দুটি গোপন কোড নম্বর দেওয়া হতো। সেই নম্বর অ্যাপে নির্দিষ্ট স্থানে বসিয়ে দিলেই অ্যাকাউন্টে ডলার যোগ হতো।
এর পাশাপাশি নতুন সদস্য যুক্ত করতে পারলে বাড়তি সুবিধা বা কমিশন দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। ফলে বেশি লাভের আশায় অনেক প্রবাসী তাদের সহকর্মী, বন্ধু ও স্বজনদেরও এই প্রতিষ্ঠানে যুক্ত করেন। এতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়।
প্রথম দিকে নিয়ম মেনে কিছু অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও গত ১০ আগস্ট থেকে অর্থ উত্তোলন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রবাসীদের কোটি কোটি টাকা আটকে রেখে প্রতিষ্ঠান দুটির সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
প্রতারণার শিকার আব্দুর রহমান নামের এক প্রবাসী বলেন, ‘শুরুতে আমার কিছুটা সন্দেহ ছিল। কিন্তু সহকর্মীদের টাকা তুলতে দেখে এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুর অনুরোধে ধার-দেনা করে ১৫০০ ডলার বিনিয়োগ করি। কিছুদিন হলো আমার অ্যাকাউন্টে ৮০০ ডলার জমাও হয়েছিল। এখন সব শেষ।’
আরেক ভুক্তভোগী সুমন শেট বলেন, ‘আমার অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩০ হাজার ডলার জমা ছিল। শুরুতে কয়েকবার টাকা তুলতে পেরেছিলাম। পরে বেশি মেয়াদের জন্য জমা রাখলে লাভ বেশি হবে ভেবে আর তুলিনি। পরিচিত অনেকের কাছ থেকেও বিনিয়োগ করিয়েছিলাম। এখন পুরো টাকাটাই গেছে, আর যাদের যুক্ত করেছিলাম তারাও আমাকে দোষারোপ করছে। বহু কাছের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেছে।’
এ বিষয়ে কুয়েত বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মঈন উদ্দিন সরকার বলেন, ‘যে কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ বিনিয়োগ করার আগে প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, সরকারি অনুমোদন ও অর্থ তুলে নেওয়ার নিয়ম ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি। কয়েক বছর পরপর ভিন্ন ভিন্ন নামে এসব প্রতারক চক্র বাজারে আসে। প্রায় চার বছর আগে একটি বহুমুখী বিপণন প্রতিষ্ঠান একইভাবে সাধারণ প্রবাসীদের কোটি কোটি টাকা নিয়ে সটকে পড়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, পরিশ্রম ছাড়া রাতারাতি আয় কিংবা নতুন সদস্য যুক্ত করে কমিশন পাওয়ার মতো যে কোনো প্রলোভন দেখলেই প্রবাসীদের সর্বোচ্চ সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
এমআরএম
মালয়েশিয়ার এসডিজি সামিটে নজর কেড়েছে ইয়ুথ হাব
মালয়েশিয়ান ইয়ুথ এসডিজি সামিট-২০২৬-এ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা ইয়ুথ হাব ফাউন্ডেশন বারহাদ।
দেশটির সামাজিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী এ সম্মেলনে সংস্থাটির অংশগ্রহণ ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক এ আয়োজনে স্থাপিত ১৩টি প্রদর্শনী বুথের মধ্যে ইয়ুথ হাবের বুথ ছিল অন্যতম আকর্ষণ।
সামিটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মালয়েশিয়ার যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক উপমন্ত্রী মোরদি আনাক বিমল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন এপিপিজিএম-এসডিজির সচিবালয় প্রধান ড. ডেনিসন জয়াসুরিয়া, জাতিসংঘের মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ব্রুনাইয়ের আবাসিক সমন্বয়কারী নিকোলাস মিন্ট এবং সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সিনেটর ড. হাজি জুফিতরি জোহা।
অনুষ্ঠানের সার্বিক সমন্বয় করেন মাইএসডিজি একাডেমির পরিচালক জোয়েল এনজি। এবারের সামিটের প্রতিপাদ্য ছিল ‘দ্য ফিউচার অব দ্য সোশ্যাল ইকোনমি’ (সামাজিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ)। মালয়েশিয়ার ১৩তম জাতীয় পরিকল্পনা (আরএমকে-১৩) এবং সিক্স হেলিক্স ইনোভেশন মডেল-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয়োজিত এ জাতীয় নীতি পরামর্শ (পলিসি কনসালটেশন)-এ সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও তরুণ প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অংশগ্রহণকারীদের মতামতের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সামাজিক অর্থনীতি বিষয়ক নীতিমালা প্রণয়নের জন্য সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়।
ইয়ুথ হাবের প্রদর্শনী বুথে ইকো-প্রিন্ট, ক্লে জুয়েলারি, গার্মেন্টস বর্জ্য থেকে তৈরি পুনঃব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি ন্যাপকিন, ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং (এমএল), সামাজিক অর্থনীতি, নারী ক্ষমতায়ন, নেতৃত্ব উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। এসব উদ্যোগ দেশি-বিদেশি দর্শনার্থী, নীতিনির্ধারক ও উন্নয়নকর্মীদের প্রশংসা কুড়ায়।
ইয়ুথ হাবের ক্রিয়েটিভ অ্যান্ড কালচারাল বিভাগের প্রধান নিয়ান সাহার নেতৃত্বে সম্মেলনে অংশ নেন সংস্থাটির এসডিজি এজেন্ট রফিকুল ইসলাম, জারিফ হামিম ইরাম এবং কাজী নাফিয়া ইসলাম।
তারা বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সংস্থা ও অংশীদার প্রতিষ্ঠানের কাছে ইয়ুথ হাবের কার্যক্রম এবং বাংলাদেশের যুব নেতৃত্বাধীন উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলো তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক এ সম্মেলনে ইয়ুথ হাবের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের তরুণদের উদ্ভাবন, প্রযুক্তি শিক্ষা, নারী ক্ষমতায়ন, সামাজিক উদ্যোগ ও টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রমকে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে যুব উন্নয়ন, সামাজিক উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারে এ অংশগ্রহণ ইতিবাচক অবদান রাখবে।
ইয়ুথ হাব ফাউন্ডেশন বারহাদ বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়াভিত্তিক একটি যুব নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা। সংস্থাটি জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজিস) বাস্তবায়নে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, সামাজিক উদ্ভাবন ও যুব ক্ষমতায়নে কাজ করছে।
এছাড়া এসডিজি-৩ (সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল), এসডিজি-৪ (গুণগত শিক্ষা), এসডিজি-৫ (লিঙ্গ সমতা), এসডিজি-৮ (শোভন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি), এসডিজি-৯ (শিল্প, উদ্ভাবন ও অবকাঠামো), এসডিজি-১৩ (জলবায়ু কার্যক্রম) এবং এসডিজি-১৭ (অংশীদারত্ব) বাস্তবায়নে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে। মালয়েশিয়ার সিএসও-এসডিজি অ্যালায়েন্স-এর সদস্য হিসেবেও সংস্থাটি দেশটিতে টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে।
এমআরএম