সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের ‘পর্দা আর দেয়াল’ দুটোই সরিয়ে দিয়েছে। এই পর্দা কিংবা দেয়াল সরানোর অর্থ একই স্ক্রীনে, একই মন্তব্য-ঘরে, একই স্ট্যাটাসের আলোয় সব কিছুই উদ্ভাসিত হওয়ার সুযোগ। তবে ডিজিটাল উম্মুক্ততার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নারীদের উপর। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নারীদের চার দেয়াল ডিঙিয়ে বিশ্বমঞ্চে কণ্ঠ তুলে ধরার অভূতপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছে।
এতে একদিকে যেমন তৈরি হয়েছে নিজেদের কথা স্বাধীনভাবে বলার সুযোগ, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে শালীনতার নাম করে নীতিপুলিশি আর ট্রোলিং-এর নতুন ভার্চুয়াল খাঁচা। অধিকার, শালীনতা ও স্বচ্ছন্দ্যের ত্রিমাত্রিক সমীকরণে সমাজে নারীর অবস্থান ঠিক কোথায় সেটিই আজকের দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সাহিত্য, রাজনীতি, প্রতিবাদ কিংবা ব্যক্তিগত উপলব্ধি যে কোনো বিষয়ে নারী এখন নিজের ভালোলাগা, মন্দলাগা অর্থাৎ মতামত সরাসরি প্রকাশ করতে পারছেন। কোনো মিডিয়া, কোনো দল কিংবা কারো গেটকিপিং ছাড়াই কথা বলতে পারছেন, নিজেকে উপস্থাপন করতে পারছেন। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামকে কাজে লাগিয়ে হাজারো নারী ঘরে বসেই সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠছেন। অর্থনৈতিক এই স্বাবলম্বিতা তাদের আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কিন্তু বাস্তব সমাজের মতোই ভার্চুয়াল জগতেও নারীদের প্রতিনিয়ত পার হতে হয় ‘শালীনতা’র এক অদৃশ্য পরীক্ষা। সমাজ যুগের পর যুগ ধরে কিংবা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শালীনতার যে সংজ্ঞা ঠিক করে রেখেছে, যে লক্ষ্মণরেখা এঁকে রেখেছে তা আজ এই সময়ে এসে অনেক বেশি চড়া সুর ধারণ করেছে; বলা যায় সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। পোশাক কেমন হবে, কথা বলার ঢং কেমন হবে, কতটুকু হাসা যাবে, কতখানি কাঁদা যাবে— এসবের ফ্রি পরামর্শ এবং নীতিশিক্ষার সমারোহ চলে ফেসবুকে এবং বাস্তবেও। অথচ শালীনতা কোনো পোশাক কিংবা ভঙ্গিতে সীমাবদ্ধ নয়।
শাড়ি পরা যাবে না, পরতে হবে তাদের নির্দেশিত ডিজাইনের জামা, হিজাব কিংবা বোরখা। চুল খোলা যাবে না, টিপ পরা যাবে না— এরকম আরও অনেক কিছু। সুযোগ পেলেই এসব কানুন বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। অথচ নারীর স্বেচ্ছাসেবী রাখালেরা জানে না— শালীনতা ব্যক্তিত্বের লালন, যা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থেকে আসে। শালীনতা আর পর্দাপ্রথার দোহাই দিয়ে নারীর চিন্তার স্বাধীনতা, বা পোশাক নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রণ করার এই মানসিকতা মূলত তাদের উপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে। শালীনতা ব্যাপারটি সমাজে নিক্তিপাল্লার ওজনে একই মাপে চর্চিত হয় না। তাতে কি! যার যার রুচি, বিশ্বাস এবং অনুশীলনের ব্যাপার। বাধ্যতামূলক চাপিয়ে দিলে শিকল হয়ে যাবার সম্ভাবনা নিশ্চিত। তখন তা হয়ে ওঠে অধিকার-পরিপন্থি। অনলাইন স্পেসকে নারীর জন্য সুস্থ, নিরাপদ এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলতে সাইবার আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি আমাদের মানসিকতার পরিণত রূপান্তর এখন সময়ের দাবি।
নিজেদের মতো করে বাঁচা, চলাফেরা, বাস্তব কিংবা ভার্চুয়ালে উপস্থিত থাকা বা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে এই স্বাচ্ছন্দ্য বহুলাংশে বিঘ্নিত হয় সাইবার বুলিং, ট্রোলিং এবং অযাচিত উপদেশের কারণে। নারীদের সাফল্য, মতপ্রকাশ কিংবা ছবি—সব কিছুর নিচে একদল হিংস্র মানুষের ব্যক্তিগত আক্রমণ করার প্রবণতা প্রমাণ করে যে, স্ক্রীনের আড়ালে বসে অন্যকে বিচার করা যতটা সহজ, অন্যের আত্মমর্যাদাকে সম্মান করা তার চেয়ে বেশি কঠিন।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে প্রধান শিক্ষিকার ছোট্ট একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে যে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে তা কেবল একটি রিল নয়, তা আমাদের সমাজের মানসিকতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংস্কৃতি এবং পেশাগত নৈতিকতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। একজন শিক্ষক একজন মানুষ; তারও ব্যক্তিগত জীবন, শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। সব পেশার মানুষ গান শুনতে পারেন, লিখতে পারেন, অভিনয় করতে পারেন, সামাজিক মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিগত মুহূর্ত ভাগ করে নিতে পারেন। হ্যাঁ শিক্ষকতা একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ পেশা, সচেতন শিক্ষকমাত্রই বিষয়টি জানেন। কিন্তু আমরা বিচারকের আসনে বসার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে জানি না। যে কারণে একটি ছোট ভিডিও, কয়েক সেকেন্ডের ক্লিপ, কিংবা একটি স্থির চিত্রের ভিত্তিতে একজন মানুষের চরিত্র, যোগ্যতা কিংবা নৈতিকতা সম্পর্কে চূড়ান্ত রায় দিয়ে দেই। কখনও ব্যক্রিগত আক্রমণ, কখনও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য, কখনও অপমান, নারীত্ব নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। অথচ পুরো বিষয়ের পেছনের প্রেক্ষাপট, সময়, উদ্দেশ্য কিংবা প্রকৃত ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
তবে শিক্ষক যদি বিদ্যালয়ের পরিবেশ, সরকারি সম্পদ বা দাপ্তরিক পরিচয় ব্যবহার করে এমন কোনো কর্মকাণ্ড করেন যা সরকারি আচরণবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তবে সেটি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে যাচাই হওয়া উচিত। সে দায়িত্ব ফেসবুক সদস্যদের নয়, আপামর জনতারও নয়, এই জ্ঞানটুকুই আমাদের জাতির সর্বাগ্রে হওয়া দরকার।
সোশ্যাল মিডিয়া কোনো আলাদা জগত নয়, এটি আমাদের বাস্তব সমাজেরই ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি। এখানে নারীর অধিকার নিশ্চিত হওয়া মানে তার স্বাচ্ছন্দ্যে বাঁচার অধিকার থাকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই সংক্ষিপ্ত ভিডিও ক্লিপে দেখা গেছে একজন শিক্ষিকা বিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় শাড়ি পরে হাঁটছেন। আর ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানটি। কয়েক সেকেন্ডের ওই ভিডিওটি সেকেন্ডেই ছড়িয়ে পড়ে। সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভাইরাল’ হয়ে যায়। দৃশ্যটি নিয়ে দেশ বিদেশ থেকে অনেকেই ট্রল করা শুরু করে। নেট দুনিয়ায় তারা ওই শিক্ষিকাকে সাইবার অ্যাটাক করে।
পরবর্তীতে জানা যায় তিনি সিলেট জেলার নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, সেটি আলাদা বিষয়। তার সেই ভিডিওতে কি আছে যা তাকে ‘অপরাধী’ করে? আতস কাঁচের নিচে রেখেও অপরাধ ধরতে না পেরে তার পাশে দাঁড়ান দেশের শিক্ষক সমাজ, সকল পেশার সাধারণ মানুষ। তারা প্রতিবাদে নেমে পড়েন। তারা নিজেদের ভিডিও, স্থির ছবি আর ওই ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গান দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিতে থাকেন— এমন অভিনব প্রতিবাদে সয়লাব হয়ে ওঠে নেট দুনিয়া। এটিও ভাইরাল হয়ে যায়। এত চমৎকার ভাইরাল ইতিপূর্বে কেউ দেখেছে কিনা জানি না। একটি গানের টিকটক রিল তাকে নেতিবাচকভাবে ভাইরাল করেছে আর সেটির প্রতিবাদে তার প্রতি তথা সুস্থতার প্রতি মানুষের সংহতি কয়েকদিন ধরে চলছে!
উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়া বাংলাদেশের মানুষ আজ যে প্রতিবাদ করছে তা আরো পূর্বেই করা উচিত ছিল বলে আমি মনে করি। সাম্প্রতিক ঘটনাটি আমাদের আরেকটি শিক্ষা দেয়, ডিজিটাল যুগে খ্যাতি যেমন মুহূর্তে আসে, তেমনি অপবাদও মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কখনই অপমান, হয়রানি বা চরিত্র হননের লাইসেন্স হতে পারে না। সবশেষে একটি সভ্য সমাজের পরিচয় হয় তার বিচারবোধে। আবেগ গুজব কিংবা জনরোষের ওপর নয়।
প্রাসঙ্গিকভাবে আসে ধর্মের মানবিক শিক্ষা নয় বরং ধর্মের নামে বজ্জাতি, ধর্মান্ধতার উচ্চকণ্ঠ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সংকুচিত করে দিচ্ছে। সহনশীলতার জায়গায় জন্ম দিচ্ছে অসহিষ্ণুতা, প্রশ্ন করার সাহসকে ঢেকে দিচ্ছে অন্ধ আনুগত্য। মানুষের পোশাক, সংস্কৃতি, শিল্পসাহিত্য, আনন্দ— সব কিছুই যেন এক অদৃশ্য নজরদারির জালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। যে ধর্মবোধ মানুষের হৃদয়ে মায়া, ন্যায়পরায়ণতা এবং মানবতার আলো জ্বালানোর কথা বলে, সেই ধর্মের নাম ব্যবহার করে যখন ত্রাস, ঘৃণা, বিভাজন কিংবা সংকীর্ণতা ছড়িয়ে দেওয়া হয় তখন সমাজ ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক ছন্দ হারাতে থাকে।
একটি সুস্থ সমাজের শক্তি ধর্মান্ধতায় নয়, বরং ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের প্রতি পারস্পরিক সম্মান, যুক্তিবোধ এবং মানবিক সহাবস্থানে। পৃথিবীতে অনেক দেশ আছে তাদের ফেসবুক নাই। আমাদেরও সময় এসেছে, ভেবে দেখার। সবকিছু সবার জন্য নয়। যেমন বানরের হাতে কোদাল নয়। অনেক বছর আগের কথা— আমার জীবনের এক উজ্জ্বল সকাল ছিল সেদিন। দেশের বাইরে যাব বলে নির্দিষ্ট দূতাবাস থেকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র হাতে পেয়ে আনন্দিত মনে গাড়িতে উঠেছি। ভবিষ্যতের কিছু স্বপ্ন রঙিন প্রজাপতির মতো উড়ছে চোখের সামনে, সামান্য দু’চাকা এগুতেই চোখ আটকে গেল একটি দেয়ালে। মোটা অক্ষরে সেখানে লেখা: ‘এখানে প্রস্রাব করিবেন না, করিলে জরিমানা করা হইবে’।
মুহূর্তেই আমার রঙিন প্রজাপতিরা কালোকুষ্টি গুবরে পোকা হয়ে গেল। যেখানে সভ্যতার সবচেয়ে সাধারণ পাঠটুকু দেয়ালে লিখে, জরিমানার ভয় দেখিয়ে আমাদের শেখাতে হয়, সেখানে আমি ঐ উন্নত দেশে যাবার কতটুকু যোগ্যতা রাখি? মনে হলো, একটি জাতির পরিচয় কেবল তার পাসপোর্টে নয় দেয়ালেও লেখা থাকে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক