নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সব বাধা ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে চলতি বছরই দেশে ফিরব।’ তার ভাষ্য, দেশে ফেরা তার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক ই-মেইল সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি।
নিজের বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রসঙ্গে সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এটি কোনো বিচার নয়; বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অসাংবিধানিক ও অবৈধ প্রক্রিয়ার ফল। বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।’
তিনি বলেন, ‘আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। মানুষের কল্যাণ এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যেই রাজনীতি করি। মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না। অতীতেও বহু ষড়যন্ত্র ও হত্যাচেষ্টা মোকাবিলা করেছি। তাই সব বাধা উপেক্ষা করে চলতি বছরই দেশে ফিরব।’
আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান নিয়ে যা বললেন শেখ হাসিনা
দলীয় সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ কেবল একটি রাজনৈতিক সংগঠন নয়, এটি বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত একটি শক্তি। অতীতে বহুবার নিষিদ্ধ ও নির্যাতনের শিকার হলেও জনগণের সমর্থনে দলটি বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যর্থতার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং জনগণের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান সরকারের সময় দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি
দল নিষিদ্ধ থাকা এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলার বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কোনো সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। তাঁর দাবি, জনগণের সমর্থন থাকায় দলকে রাজনৈতিকভাবে দমিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক মামলাগুলো প্রত্যাহার এবং রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন।
‘দেশ তার মৌলিক চরিত্র হারাচ্ছে’
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ৫ আগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর আঘাত এসেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান, স্মৃতিসৌধ ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, দেশে উগ্রবাদের বিস্তার ঘটছে।
একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন। তার দাবি, আওয়ামী লীগই আবার দেশকে স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী, আহমদিয়া ও সুফি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার পরিপন্থী।
তিনি বলেন, সংখ্যালঘুরা কোনো ভোটব্যাংক নয়; তারা সমান মর্যাদার নাগরিক। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং হামলার ঘটনায় দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
নির্বাসিত জীবনের অভিজ্ঞতা
ভারতে অবস্থান প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ব্যক্তিগত জীবন অনেক আগেই দেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছেন। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও তার মন পড়ে থাকে বাংলাদেশে।
এছাড়া বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে গোপন সমঝোতার গুঞ্জনকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ কারও রাজনৈতিক দয়া চায় না। গণতন্ত্র এবং জনগণের ভোটাধিকার কোনো গোপন দর-কষাকষির বিষয় নয়; এগুলো সাংবিধানিক অধিকার।”
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ (মঙ্গলবার)। দিবসটি ঘিরে সম্ভাব্য অপতৎপরতা ও নাশকতার আশঙ্কায় সরকার গোপালগঞ্জসহ দেশের ছয় জেলায় সেনা মোতায়েন করেছে। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন বিএনপি, এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন, জামায়াতে ইসলামী এবং গণঅধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও সতর্ক অবস্থানে থাকার প্রস্তুতি নিয়েছে।
যদিও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে বিএনপি কিংবা জামায়াত আনুষ্ঠানিক কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। তবে দলগুলোর নেতারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হলে তা মোকাবিলায় তারা মাঠে সক্রিয় থাকবেন।
বিএনপির নেতারা জানান, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় দলটির নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করেছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনও তারা মাঠে নামার চেষ্টা করতে পারে। এ কারণে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে বিএনপির কোনো কর্মসূচি নেই। তবে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
তিনি বলেন, বেআইনি কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব এবং তারা সেই দায়িত্ব পালন করবে।
এদিকে অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে আজ দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে জাতীয়তাবাদী যুবদল। জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানা ও পৌর এলাকায় এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। সোমবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যুবদলের শীর্ষ নেতাদের এক জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
যুবদলের দপ্তরের দায়িত্বে থাকা সহসভাপতি নুরুল ইসলাম সোহেল বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী আন্দোলনের নামে নাশকতা, সহিংসতা কিংবা অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে যুবদলের নেতাকর্মীরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করবে। তিনি দলের নেতাকর্মীদের শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানান।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি না থাকলেও সংগঠনটির নেতাকর্মীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নিজ নিজ এলাকায় সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে আমাদের পক্ষে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নাই। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ যদি অস্থিতিশীল ও নৈরাজ্য পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা করে সেক্ষেত্রে ছাত্রদল সতর্ক অবস্থানে থাকবে। তবে, প্রতিরোধ ও প্রতিহত করার দায়িত্ব সরকারের।
জানা গেছে, যুবদল ও ছাত্রদলের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বিএনপির অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদেরও মাঠে সক্রিয় থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন বলেন, গত দুই দিন ধরেই তাদের নেতাকর্মীরা মাঠে রয়েছেন। মঙ্গলবারও তারা সতর্ক অবস্থানে থাকবেন। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বা তাদের দোসররা কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিহত করা হবে।
অন্যদিকে আজ (২৩ জুন) বিকাল ৫টায় রাজধানীর বিজয়নগরে গণহত্যার বিচারে ধীরগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং নেতাকর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে সমাবেশ করবে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।
গণঅধিকার পরিষদও সোমবার রাতে রাজধানীর পল্টন ও জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে। দলটি আজ সারা দেশে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে।
দলটির সভাপতি নুরুল হক নুর এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, শুধু সরকারের পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়, ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলোর সমন্বিত কর্মসূচি প্রয়োজন। ফ্যাসিবাদ প্রশ্নে জুলাইয়ের ঐক্য জাগ্রত থাকা উচিত।
This website 'npbnews.com' would like to send push notifications