• ই-পেপার

হামের প্রাদুর্ভাব, চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল

অনলাইন ডেস্ক
হামের প্রাদুর্ভাব, চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল
ছবি: কালের কণ্ঠ

দেশে শিশুদের মধ্যে হামজনিত নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৯ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।

আরো পড়ুন

মিরপুরে শিশুকে গলা কেটে হত্যা

 

আদেশে বলা হয়, আপদকালীন সময়ে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং হাম প্রতিরোধে টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ও অধিদপ্তরাধীন সব প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের অর্জিত ছুটি ও নৈমিত্তিক ছুটি স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে।

আরো পড়ুন
মোটরসাইকেল মালিকদের থেকে কিভাবে নেওয়া হবে অগ্রিম আয়কর

মোটরসাইকেল মালিকদের থেকে কিভাবে নেওয়া হবে অগ্রিম আয়কর

 

এতে আরো বলা হয়, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে জারি করা এ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে।

 

তামাকের বিরুদ্ধে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় নারী এমপিদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
তামাকের বিরুদ্ধে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় নারী এমপিদের

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাকের ভয়াবহ ছোবল থেকে বাঁচাতে তামাকের বিরুদ্ধে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন নারী সংসদ সদস্যরা।

মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে তামাকবিরোধী সংসদীয় নারী ফোরামের সভায় এ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা। এতে সভাপতিত্ব করেন ফোরামের চেয়ারপারসন ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান।

সভায় জানানো হয়, তামাকজাত দ্রব্যে কর ও মূল্যবৃদ্ধি তামাক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কার্যকর ও পরীক্ষিত উপায়। বিশ্বের বহু দেশ এই উপায়ে তামাক নিয়ন্ত্রণে সফলতা অর্জন করেছে। যেহেতু ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট আসন্ন, তাই এই বাজেটে তামাকজাত দ্রব্যে কর ও মূল্যবৃদ্ধির বিষয়েও সভায় জোর দাবি জানানো হয়।

সংসদ সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম একটি বিষয় ছিল জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও তামাক নিয়ন্ত্রণ। তারই প্রতিফলনস্বরূপ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করা হয়। তবে আমরা মনে করি, শুধু আইন পাস করাই যথেষ্ট নয়, তামাক নিয়ন্ত্রণ একটি চলমান যুদ্ধ। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই যুদ্ধে আমাদের জয় হবেই।’

তামাকবিরোধী মায়েদের ফোরামের আহ্বায়ক শিবানী ভট্টাচার্য বলেন, হার্ম রিডাকশন (Harm Reduction)-এর নামে তামাক কম্পানিগুলো ই-সিগারেট, ভ্যাপ, নিকোটিন পাউচ ইত্যাদি নানা নামে নতুন নতুন নিকোটিন পণ্য বাজারজাত করছে, যা তামাক ব্যবসায়ী চক্রের এক অভিনব ব্যাবসায়িক কৌশল। এই কৌশলের মাধ্যমে তারা কিশোর-তরুণদের বিভ্রান্ত করছে এবং দেশের কিশোর-তরুণদের এক নেশার জগতে ঠেলে দিচ্ছে। সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে এই বিষয়টি প্রতিফলিত না হলেও আমাদের কাজ হবে প্রতিনিয়ত এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। কারণ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে কোনো প্রকার তামাকজাত পণ্যেই ছাড় দেওয়া সম্ভব নয়।

তামাকবিরোধী শিক্ষক ফোরামের সহ-আহ্বাক তনুশ্রী হালদার বলেন, তামাকের ক্ষতি কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নারী সংসদ সদস্যরা যেহেতু জনগণের নিকট দায়বদ্ধ তাই তাদের সঙ্গে মিলে আমরা সবাই একসঙ্গে তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারব বলে আমি বিশ্বাস করি।

সভায় তামাকবিরোধী সংসদীয় নারী ফোরামের রাশেদা বেগম হীরা, নেওয়াজ হালিমা আরলী, ফরিদা ইয়াসমীন, নিলোফার চৌধুরী মনি, সাবিরা সুলতানা, সানসিলা জেবরিন, সানজিদা ইসলাম, ফাহমিদা হক, ফেরদৌসী আহমেদ, জহরত আদিব চৌধুরী, আরিফা সুলতানা, সানজিদা ইয়াসমিন, শওকত আরা আক্তার, মাধবী মার্মা এবং রেজেকা সুলতানা উপস্থিত ছিলেন।

আরো ছিলেন নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আকতার ডলি, নারী সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক লাবিন রহমান ও তামাকবিরোধী ইয়ুথ ফোরামের সদস্য তাসফিয়া নওরীন, রাইসুল ইসলাম ও আশরাফিয়া জান্নাত। সভায় সবাই একসঙ্গে তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সমাজের সব স্তরের অসমতা দূর করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব : স্পিকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
সমাজের সব স্তরের অসমতা দূর করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব : স্পিকার
ছবি : কালের কণ্ঠ

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘সমাজের সব স্তরের অসমতা দূর করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দেশ ও সমাজের নানা স্তরের অসমতা দূর করতে অল পার্টি ককাস কাজ করতে পারে। যার মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে পিছিয়ে পড়া ও প্রান্তিক জনগণের অবদানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত হবে।’

মঙ্গলবার (১৯ মে) স্পিকারের সংসদ ভবনস্থ কার্যালয়ে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠককালে এসব কথা বলেন তিনি।

আরো পড়ুন
বিশ্ববাজারে সোনা-রুপার দামে বড় পতন

বিশ্ববাজারে সোনা-রুপার দামে বড় পতন

 

প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলে আরো ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধূরী, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উইম্যান উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (ডব্লিউডিডিএফ) নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি, ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান প্রমুখ।

সাক্ষাৎকালে তারা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপদ খাদ্যে অধিকার নিশ্চিতে ককাসের ভূমিকা নিয়ে মতবিনিময় করেন। তারা সমাজের পিছিয়ে পড়া অনগ্রসর এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য এর শান্তি, ন্যায়বিচার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান অভীষ্ট বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি সহায়তা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আরো পড়ুন
পাবনায় টাকা ছাড়াই খাওয়া যাচ্ছে লিচু

পাবনায় টাকা ছাড়াই খাওয়া যাচ্ছে লিচু

 

এ সময় প্রতিনিধিদল হাফিজ উদ্দিন আহমদ ‘স্পিকার’ পদে নির্বাচিত হওয়ায় তাকে অভিনন্দন জানান এবং সম্প্রতি স্পিকারের সহধর্মিণী বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ দিলারা হাফিজের মৃত্যুতে সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

একটি ডেথ সার্টিফিকেটের পোস্টমর্টেম

জয়নাল আবেদীন, তানভীরুল ইসলাম ও সুজন মাহমুদ
একটি ডেথ সার্টিফিকেটের পোস্টমর্টেম

কুড়িগ্রামের উলিপুর থানার বুড়াবুড়ি সাতভিটা এলাকার চাঁদ মিয়ার ছেলে আশিকুর রহমান (২৪) রাষ্ট্র্রের চোখে একজন ‘জুলাই শহীদ’। এ জন্য স্বীকৃতির পাশাপাশি অনুদানের ৩০ লাখ টাকাও বুঝিয়ে দেওয়া হয় পরিবারকে।

কিন্তু কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আন্দোলনের ধারেকাছেই ছিলেন না আশিকুর। মস্তিষ্কে সংক্রমণজনিত অসুস্থতার চিকিৎসায় পুরোটা সময় ছিলেন হাসপাতালের বিছানায়। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে ‘ব্রেন ইনফেকশন’ লেখা থাকলেও আশিকুরের ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ লেখা হয় ‘হেড ইনজুরি’। 

কালের কণ্ঠের সরেজমিন অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর আশিকুর রহমান মূলত মস্তিষ্কে সংক্রমণজনিত (পরিবারের সদস্যদের ভাষায় ব্রেন টিউমার) কারণেই মারা গেছেন। 

এরপর তার মৃত্যুর এক মাস ১০ দিন পর কুড়িগ্রাম সদর থানায় একটি হত্যা মামলা (নম্বর ১৩) করা হয়। মামলায় আসামির সংখ্যা ১০৪, যেখানে তিনজন সাংবাদিক। গত বছরের ১৫ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় জুলাই শহীদদের নামের তালিকাসংবলিত গেজেট প্রকাশ করে। ওই গেজেটে ২১৭ নম্বরে আছে আশিকুরের নাম।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার বরাতে গত সোমবার কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ সাংবাদিকতাকে বিক্ষত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে পরিকল্পিতভাবে অন্তত ৪৯টি মামলায় ২৮২ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। মামলার নথিগুলো যাচাই করে দেখা গেছে, বেশির ভাগই অদ্ভুত এবং কারসাজিতে ভরা।

আশিকুর রহমানের মামলা নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমাদের হাতে আসে তার চিকিৎসাপত্র এবং মৃত্যুসনদ। প্রথম চিকিৎসা নথি অনুযায়ী, তিনি ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিট-১ বিভাগের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে (বি-১১ শয্যা) চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখান থেকে তাঁকে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (তৎকালীন বিএসএমএমইউ) রেফার করা হয়। 

রংপুর মেডিক্যালের ওই ছাড়পত্রে আশিকুরের রোগ হিসেবে লেখা ছিল, ‘সেপসিস উইথ ফোকাল সিজার (এইচ/ও এনসেফালাইটিস)’ অর্থাৎ চিকিৎসকরা তখন বলেছিলেন, রোগীর শরীরে গুরুতর সংক্রমণ ছিল। এমনকি তাঁর এনসেফালাইটিস বা ব্রেন ইনফেকশনের ইতিহাস ছিল। সেই সঙ্গে তিনি খিঁচুনিজনিত সমস্যায়ও ভুগছিলেন।

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সেই ছাড়পত্রে কোথাও উল্লেখ নেই, তিনি জুলাই আন্দোলনে মাথায় আঘাত বা সে কারণে কোনো ধরনের ট্রমা, ব্লান্ট ইনজুরিতে আহত ছিলেন। অর্থাৎ চিকিৎসার প্রথম আনুষ্ঠানিক নথিতে তাঁকে একজন সংক্রমণজনিত জটিলতায় আক্রান্ত রোগী হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথম ছাড়পত্রের মাত্র কয়েক দিন পর পরিস্থিতি বদলে যায়। মৃত্যুর প্রত্যয়নপত্র অনুযায়ী, আশিককে ২৬ আগস্ট রাত ৯টা ৪০ মিনিটে বিএমইউর আইসিইউ-২-তে ভর্তি করা হয়। এরপর তিনি মারা যান ১ সেপ্টেম্বর দুপুর দেড়টায়। এরপর বিএমইউ থেকে দেওয়া মৃত্যুসনদে আগের চিকিৎসার ইতিহাস হঠাৎ করেই নতুন মোড় নেয়। 

ডেথ সার্টিফিকেটে যা বলা হয়েছে

আশিকুর রহমানের মৃত্যুসনদ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রোগের ঘরে লেখা হয়— ‘সেপটিক শক উইথ একেআই উইথ মেনিনগোএনসেফালাইটিস উইথ অ্যালেজড এইচ/ও হেড ইনজুরি ডিউরিং স্টুডেন্ট প্রোটেস্ট’। অর্থাৎ এখানে নতুনভাবে যুক্ত হয়—সেপটিক শক (গুরুতর সংক্রমণের কারণে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হওয়ার মতো সংকটজনক অবস্থা), অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি (হঠাৎ কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া/কিডনি ফেইলিওরের অবস্থা), মেনিনগোএনসেফালাইটিস (মস্তিষ্ক ও মস্তিষ্কের আবরণে প্রদাহ/সংক্রমণ) এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘অ্যালেজড হিস্ট্রি অব হেড ইনজুরি ডিউরিং স্টুডেন্ট প্রোটেস্ট’ অর্থাৎ ছাত্র আন্দোলনের সময় মাথায় আঘাত পাওয়ার অভিযোগ/ইতিহাস ছিল। এরপর মৃত্যুর কারণে লেখা হয়, ‘ইরিভার্সিবল কার্ডিওরেসপিরেটরি অ্যারেস্ট ডিউ টু অ্যাবাভ মেনশনড ডিজিজেস’। অর্থাৎ উপরোক্ত রোগগুলোর কারণে অপরিবর্তনীয় হৃদযন্ত্র ও শ্বাসযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মৃত্যু হয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, মৃত্যুসনদে কোনো তথ্য লেখার ক্ষেত্রে চিকিৎসা পর্যবেক্ষণই চূড়ান্ত হওয়া উচিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “মৃত্যুসনদে কোনোভাবেই ‘হেড ইনজুরি ডিউরিং স্টুডেন্ট প্রোটেস্ট’ বা এ জাতীয় কিছু লেখার সুযোগ নেই। সেখানে এর আগে ‘অ্যালেজড’ শব্দ ব্যবহার করলেও এটি সরকারি নথির অংশ হয়ে যায়। পরে সেটি ভিন্নভাবে ব্যবহার হওয়ার ঝুঁকি থাকে।”

তিনি বলেন, এ বিষয়ে ডেথ সার্টিফেকেট প্রদানকারী ডা. মন্তোষের সঙ্গে আমার কথা হয়নি। কিন্তু ঘটনা শুনে এর পেছনে ভিন্ন কিছু বা তৎকালীন সময় কোনো পক্ষের চাপ ছিল বলেই মনে হয়েছে। এ ছাড়া ডেথ সার্টিফিকেটে এমন কিছু তিনি লেখার কথা না। আর যদি তিনি লিখেও থাকেন, তার পরও তিনিসহ তৎকালীন প্রশাসনকে এ বিষয়ে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। কারণ, এমন ঘটনা যে শুধু একটা ঘটেছে তা কিন্তু নিশ্চিত নয়। আমার ধারণা এমন ঘটনা আরো ঘটে থাকতে পারে। 

দুই দিন লুকোচুরির পর সেই চিকিৎসকের দায় স্বীকার 

রংপুর মেডিক্যালের চিকিৎসাপত্রে ‘ব্রেইন ইনফেকশন’ উল্লেখ থাকলেও বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেথ সার্টিফিকেটে ‘হেড ইনজুরি কিভাবে এলো—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চায় কালের কণ্ঠ অনুসন্ধানী সেল।

গত রবিবার দুপুর ১টার দিকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। প্রথমে আমরা প্রশাসনিক শাখায় গিয়ে আশিকের মৃত্যুসনদটির অস্তিত্ব নিশ্চিত করি। এবার মুখোমুখি হতে চাই সেই চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মন্তোষ কুমার মণ্ডলের, যিনি আশিকের মৃত্যুসনদে সই দিয়েছিলেন। তিনি নিজ কক্ষে নেই। ফোন করলে জানান মিটিংয়ে আছেন।

বিকেল হয়ে যায়। কিন্তু ডা. মন্তোষের দেখা নেই। এর মধ্যে আরো কয়েকবার ফোন দেওয়া হয়। আবারও মিটিংয়ের অজুহাত। দীর্ঘ অপেক্ষার পর তাঁকে খুঁজতে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সি-ব্লকের ১০ তলার এনেসথেসিয়া, এনালজেসিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগে যাই। সেখানে উপস্থিত কয়েকজন জানান, সারা দিনেও মিটিং বা কোনো কাজেই এই চিকিৎসক এই বিভাগে আসেননি। এরপর কেবিন ব্লকের সপ্তম তলায় গিয়ে সেখানেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। প্রায় তিন ঘণ্টা পর আবার ফোন করলে এবার তিনি বলেন, ‘আমি তো বেরিয়ে পড়েছি, আপনি কাল আসুন।’

আমাদের সঙ্গে ডা. মন্তোষের লুকোচুরি খেলার অবসান ঘটে গতকাল সোমবার। কিন্তু কক্ষের বাইরে কালের কণ্ঠের সাংবাদিক অপেক্ষায় আছেন—এই খবর জানতেই বেরিয়ে আসেন। আবারও ব্যস্ততার অজুহাতে চলে যেতে উদ্যত হন। আমরা তাঁর পিছু নিই। তিনি আবারও এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমরা একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একে একে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসাপত্র, ছাড়পত্র এবং তাঁর স্বাক্ষরিত সেই মৃত্যুসনদটি মেলে ধরি। তিনি না দেখেই বলে ওঠেন, ‘সব ঠিকঠাক’।

কিন্তু আমাদের একের পর এক প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত চেপে রাখা ইতিহাস বলতে শুরু করেন ডা. মন্তোষ কুমার মণ্ডল। কোনো রাখঢাক না রেখেই তিনি বলে দেন, ‘এই ছেলে (আশিক) মূলত সেপটিক শকে মারা গেছে। আমরা ওর শরীরে কোনো হেড ইনজুরি পাইনি।’

আরো বলতে থাকেন, ‘মেডিক্যাল বোর্ডের অধীনে এমআরআই করা হয়েছিল। সেখানেও মাথায় আঘাতের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’ অর্থাৎ মেডিক্যাল বোর্ড আঘাতের প্রমাণ পায়নি, এমআরআইতেও আঘাতের চিহ্ন ছিল না। তবু মৃত্যুসনদে ‘হেড ইনজুরির’ ইতিহাস লেখা হয়েছে।

ঠিক কী কারণে আঘাতের কোনো ঘটনা না ঘটলেও ‘হেড ইনজুরি’ লেখা হয়েছিল—এ প্রশ্নের উত্তরে ডা. মন্তোষ বলেন, “তখন স্টুডেন্টরা দাবি করেছিল এটি প্রটেস্ট করতে গিয়ে হয়েছে। ওই সময়ের পরিস্থিতি কী ছিল তা তো আপনারা বোঝেন। তাদের দাবির মুখেই আমরা ‘Alleged’ শব্দটি ব্যবহার করেছি। এর অর্থ হলো এটা তাদের দাবি, আমাদের কনফারমেশন নয়।”

চাপের মুখে চিকিৎসা নথিতে এমন মিথ্যাচারের সুযোগ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, ‘এটা শুধু আমার সিদ্ধান্ত ছিল না। সে সময় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের সবাই মিলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।’ ওই মেডিক্যাল বোর্ডে কে কে ছিলেন, জানতে চাইলে ডা. মন্তোষ ‘প্রায় দেড় বছর আগের ঘটনা, নাম মনে করতে পারছি না’—এসব অজুহাত তুলে আর কিছু বলতে রাজি হননি। 

স্থানীয় সমন্বয়করাই বললেন—আশিক আন্দোলনে ছিলেন না 

এবার কুড়িগ্রামের পথে কালের কণ্ঠ অনুসন্ধানী দল। গত শুক্রবার রাতের বাস ধরে ভোরে পৌঁছে যাই কুড়িগ্রাম। এরপর সেখান থেকে ইজি বাইকে উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের কাশেম বাজার এলাকায়। এখানেই আশিকের বাড়ি।

আমরা কথা বলি আশিকের ছোট ভাই ও বাবার সঙ্গে। তাঁরা কোনো প্রকার তথ্য দিতে রাজি হননি। কালের কণ্ঠকে তাঁরা জানান, আশিক মারা যাওয়ার পর জুলাই শহীদের সুবিধা নিতে সব কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। এ সময় তাঁরা আশিকের চিকিৎসার কোনো কাগজপত্র দেখাতেও রাজি হননি। 

সরেজমিনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী একাধিক সমন্বয়কের সঙ্গে আলাপ হয়। জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক লোকমান হোসেন লিমন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আশিক আন্দোলনেই ছিল না। তার নাম গেজেটে এলে সবাই তাজ্জব হয়ে যাই। ওই আন্দোলনের সম্পূর্ণ সিসিটিভি ফুটেজ আছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে কোথাও আশিকের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে ওর ছোট ভাই আন্দোলনে ছিল, সিসিটিভি ফুটেজে তাকে দেখা গেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমার বাড়ি আর আশিকের বাড়ি একই ইউনিয়নে। সেই সুবাদে আমি জানতাম আশিক আগে থেকেই ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত। তার পরিবার চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল। ঢাকায় গিয়ে যখন দেখে ছাত্র পরিচয় দিলেই ফ্রিতে চিকিৎসা মেলে, তখন সেই সুযোগটা নেয় তারা।’

মামলার নথি মতে, আশিক ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ঘোষপাড়ার সিংহ চত্বরে অবস্থানকালে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনসহ অপরিচিত আসামিরা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী পিস্তল, লগি-বৈঠা, চায়নিজ কুড়ালসহ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা করে। এ সময় লোহার রড দিয়ে আন্দোলনকারীদের এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়।

মামলার নথিতে আরো বলা হয়, আশিকসহ আরো কয়েকজনকে আহত অবস্থায় কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর আশিকের অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং সেখান থেকে পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন জখমের মারাত্মক যন্ত্রণা ভোগ করে আশিক মারা যান বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়।

কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে ঘটনার দিন দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক শহিদুল্লাহ লিংকনের কাছে আশিকের হাসপাতালে ভর্তির প্রমাণ চাইলে তিনি এ রকম কোনো নথি দেখাতে পারেননি। তবে এর তিন দিন পর অর্থাৎ ৭ আগস্ট পেটের ব্যথা নিয়ে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন আশিক। অথচ মাথায় আঘাতজনিত কারণে ভর্তি হওয়ার কথা সার্জারি বিভাগে।

সাধারণত এসব বিষয়ে চিকিৎসা নিতে গেলে ডাক্তারের রিপোর্টে পুলিশ কেসের সিল দেওয়া হয়। আশিকুরের চিকিৎসার নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, রংপুর মেডিক্যালের চিকিৎসাপত্র বা ছাড়পত্রে কোথাও পুলিশ কেসের সিল নেই। আবার বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির কথা বলা হলেও তারা ভর্তি করে ধানমণ্ডির একটি বেসরকারি ক্লিনিকে। খরচ বেশি হওয়ায় সেখান থেকে তাঁকে নেওয়া হয় বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে নেওয়ার পরই মূলত প্রথম তাঁর মাথায় আঘাত রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় এবং এখানেই শুধু পুলিশ কেসের সিল দেওয়া হয়।

আশিক মাঝেমধ্যে চিকিৎসা নিতেন, এমন একজন স্থানীয় চিকিৎসক কালের কণ্ঠকে বলেন, আশিকের মাথা ও শরীরের কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। মাথায়ও কোনো জখম ছিল না। কেউ মাথায় আঘাত পেলে দীর্ঘদিন তার মাথায় রক্ত জমাট বেঁধে থাকে। কিন্তু আশিকের এসব কিছুই পাওয়া যায়নি।

কুড়িগ্রাম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক রাজ্য জোতী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আশিকের মৃত্যুর দিন আমি বিকেল ৩টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছিলাম। সে আন্দোলনে আহত হওয়া দূরে থাক, অংশই নেয়নি।’ তিনি আরো বলেন, ‘তৎকালীন সদর থানার ওসি হাবিবুল্লাহ প্রথমে আমাকে তাঁর অফিসে ডাকেন। আমি গেলে আশিকের প্রকৃত ঘটনাটি তাঁকে সব বলি। এর কিছুদিন পরই ওই ওসি আমার এক বন্ধুকে কল করে তাঁর অফিসে ডাকেন। বন্ধুর সঙ্গে আমিও সেখানে যাই। যাওয়ার পর আমার বন্ধুকে আশিক হত্যা মামলার সাক্ষী হতে বলা হয়। কিন্তু নিজে থেকে কিছু বলা যাবে না, তারা (পুলিশ) যা লিখে দেবে, সেটাই মুখস্থ করে বলতে হবে আদালতে। এই কথা শোনার পর আমি সেখানে প্রতিবাদ করলে তিনি মিটিংয়ের অজুহাতে সেখান থেকে বের হয়ে যান এবং আমার বন্ধুকে বলে যান, আপনার সঙ্গে পরে কথা হবে। শুধু তা-ই নয়, পুনরায় কবর থেকে লাশ তুলে ময়নাতদন্তের জন্য আদেশ এলে ওই ওসি আশিকের পরিবারকে শিখিয়ে দেন যে, যখন পুলিশ লাশ তুলতে যাবে, তখন আপনারা বাধা দেবেন, লাশ তুলতে দেবেন না।’

সেই ওসি হাবিবুল্লাহ এখন কর্মরত আছেন নীলফামারীর ডোমার থানায়। মুঠোফোনে যোগাযোগ করে আমরা এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সব অস্বীকার করেন এবং বলেন, ‘আমি এগুলোর কিছুই জানি না। আমি এসবের দায়িত্বে ছিলাম না।’

আশিকের মৃত্যুর খবরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সেই সময় একটি পোস্ট দেন তাঁর মামা আনিছুর রহমান। ওই পোস্টের স্ক্রিনশট এসেছে আমাদের হাতে। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘দীর্ঘদিন ব্রেইন স্ট্রোকে অসুস্থ থাকা স্নেহের ভাগ্নে আশিক আজ ঢাকা শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছে।’

কুড়িগ্রামে দ্বিতীয় দিন আমরা এমন একজনের সন্ধান পাই, যিনি ৪ আগস্ট আশিকের ছোট ভাইসহ আরো তিনজনকে ডেকে সেদিন আন্দোলনে অংশ নেন। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানী দল কথা বলেছে সেই আন্দোলনকারী রাকিবুল বারী রোকনের সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার আর আশিকের বাড়ি পাশাপাশি। ৪ আগস্ট আমি নিজে আশিকের ছোট ভাই আতিককে ডেকে নিয়ে আন্দোলনে অংশ নিই। সেদিন আশিক ছিল রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আশিকের ব্রেন টিউমার ছিল প্রায় চার বছর আগ থেকে। আশিকের ছোট ভাইসহ আমরা পাঁচজন বুড়াবুড়ি ইউনিয়ন থেকে আন্দোলনে ছিলাম। সেখানে আশিক থাকার প্রশ্নই আসে না।’

আমরা কথা বলেছি জুলাই আন্দোলনে কুড়িগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া কে এম নাজমুস সাকিব শাহীর সঙ্গে। তাঁর দাবি, আশিককে হত্যা করা হয়নি। একবার আন্দোলনে আসার কথা বলে কিছুক্ষণ পরে নিজেই কলব্যাক করে নাজমুস সাকিব বলেন, ‘আশিক জুলাই আন্দোলনে আসেইনি। আশিক আগে থেকেই ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত ছিলেন। ওই রোগেই তিনি মারা যান। কিন্তু তাঁর পরিবার ও কিছু মহল তাঁকে জুলাই শহীদ সাজিয়ে এই হত্যা মামলাটা করে।’

মামলায় সাংবাদিকদের নাম আসার বিষয়ে জানতে চাইলে শাহী বলেন, এই মামলায় সাংবাদিকদের নাম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এবং পূর্বশত্রুতার জের ধরে যুক্ত করা হয়েছে। আশিক যখন মারা যান তখন সাংবাদিকরা প্রেস ক্লাবে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন নয়নের কাছে অবরুদ্ধ ছিলেন। ছাত্রলীগের নেতারা তাঁদের কোনো ধরনের সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচার-প্রকাশ করতে নিষেধ করেন।

আশিকের ঘটনায় করা মামলায় আসামিদের মধ্যে তিন সাংবাদিক হলেন কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কালের কণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি আব্দুল খালেক ফারুক, নিউজ২৪ টেলিভিশনের প্রতিনিধি হুমায়ুন কবির সূর্য এবং এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের প্রতিনিধি ইউসুফ আলমগীর।

বুকে কষ্ট, মুখে আক্ষেপ নিয়ে হুমায়ুন কবির সূর্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সে সময় কুড়িগ্রামে আমি সন্তানদের আন্দোলনে দিয়ে এসে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছি। আন্দোলনকারীদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতাও করেছি। অথচ ব্যক্তি আক্রোশে আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে।’

আব্দুল খালেক ফারুক বলেন, ‘৪০ বছরের সাংবাদিকতার জীবনে এমন লজ্জা ও অপমানজনক পরিস্থিতিতে পড়িনি কখনো। দুই বছর ধরে হত্যা মামলায় মিথ্যা আসামি হয়ে সাংবাদিকতা থেকে দূরে আছি। এটা আমার জন্য খুবই কষ্টের।’ 

সারজিস বললেন, ভুয়া হলে বাতিল করা উচিত

জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনে ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন জুলাই আন্দোলনের উজ্জ্বল মুখ সারজিস আলম। কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে তিনিও স্বীকার করেন, জুলাইয়ের পক্ষে আন্দোলনে নেমে যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁরাই জুলাই শহীদ। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শহীদের সংখ্যা এক হাজারের বেশি হবে। এমনকি সাভারের কোনো গার্মেন্টসকর্মী যদি সরাসরি আন্দোলনে অংশ না নিয়েও পথচারী হিসেবে পুলিশের গুলিতে মারা যান, তাঁকেও আমরা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছি।

গতকাল সোমবার বিকেলে মোবাইল ফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সারজিস আলম বলেন, ‘আমি দায়িত্বে থাকাকালে প্রাথমিকভাবে একটি ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া চালিয়েছিলাম। শহীদ পরিবারের ক্ষেত্রে এটি যাচাই করা তুলনামূলক সহজ ছিল। কারণ তাঁরা ডেথ সার্টিফিকেট, ঘটনাস্থলের ছবি বা লাশের ছবি নিয়ে আসতেন। এরপর স্থানীয়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে।’

আন্দোলনে অংশ না নিয়েও জুলাই শহীদের স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়ে সারজিস বলেন, “লালমনিরহাট বা ঠাকুরগাঁওয়ের এ রকম দু-একটি ঘটনা আমার নজরে এসেছিল এবং আমি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলাম। এক হাজার শহীদের তালিকায় এ রকম দু-তিনটি ভুল থাকতে পারে, যা প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে বাদ দেওয়া উচিত। কিন্তু দু-একটি উদাহরণের জন্য পুরো তালিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ঠিক হবে না। কুড়িগ্রামের ক্ষেত্রেও ডেথ সার্টিফিকেট এবং ‘কজ অব ডেথ’ যাচাই করা দরকার। যদি সত্যিই এ রকম ভুল হয়ে থাকে, তবে তা ক্রসচেক করে বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।”

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও এবং অদ্ভুত মামলার প্রসঙ্গে সারজিস বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ২০০ আসামির মধ্যে ১০০ জনেরই কোনো সম্পৃক্ততা নেই। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালীরা ব্যক্তিগত শত্রুতা বা রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য কিংবা মামলা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে অনেকের নাম দিচ্ছে। আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে বারবার বলেছি, যারা সরাসরি জুলাইয়ের বিপক্ষে হামলা বা নির্দেশনার সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিচার হোক। কিন্তু যাদের সংশ্লিষ্টতা নেই, তাদের নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়া উচিত।’ 

গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বললেন 

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাসুদ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া বা ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিরা যদি ভুলবশত এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকেন, তবে তা সংশোধনের উদ্যোগ আগে থেকেই নেওয়া হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, শুধু প্রকৃত ব্যক্তিদেরই সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে এবং যাঁরা প্রকৃত যোদ্ধা বা শহীদ নন, তাঁদের এই সুবিধার আওতাভুক্ত করা হবে না।

তিনি আরো বলেন, জুলাই আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট থেকে যাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন, তাঁদের কল্যাণে একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সেই অনুযায়ী শহীদদের স্বীকৃতির প্রক্রিয়া চলছে।

তিনি এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তুলে ধরে জানান, শহীদ হিসেবে স্বীকৃতির জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়েছিল এবং সেই আবেদনগুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিভিন্ন হাসপাতালের নথিপত্রের ভিত্তিতে যাচাই করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সভাপতিত্বে গঠিত একটি বোর্ড বা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

সরকারি জমি দখলকারীদের ছাড় না দিতে ঢাকার ডিসিকে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারি জমি দখলকারীদের ছাড় না দিতে ঢাকার ডিসিকে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে থাকা সরকারি খাসজমি যেকোনো মূল্যে উদ্ধার করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে এসব জমি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।

মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’ উপলক্ষে বিভিন্ন স্টল পরিদর্শনের সময় ঢাকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা খানমকে এ নির্দেশনা দেন সরকারপ্রধান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি খাসজমি উদ্ধারে ঢাকা জেলা প্রশাসনকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সরকারি সম্পদ রক্ষায় কোনো ধরনের আপস না করার কঠোর বার্তা দিয়েছেন তিনি।

সম্প্রতি রাজধানীর লালবাগ এলাকায় সরকারের প্রায় এক একর খাসজমি অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে সফলভাবে পুনরুদ্ধার করায় ডিসি ফরিদা খানমের ভূয়সী প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী।

জেলা প্রশাসন সূত্র বলছে, ওই অভিযানের দৃঢ়তা, প্রশাসনিক সাহসিকতা ও দ্রুত বাস্তবায়ন নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেছেন—প্রভাবশালী কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে যারা সরকারি জমি দখল করে আছেন, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি জমি উদ্ধারে চলমান অভিযান আরো জোরদারেরও নির্দেশনা দেন তিনি।

এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের সেবা সহজীকরণে 'হ্যালো ডিসি' নামের একটি জরুরি সেবা চালুর কথা প্রধানমন্ত্রীকে জানান জেলা প্রশাসক। নাগরিক সেবা সহজ করতে এমন উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ঢাকার ডিসিকে ধন্যবাদ জানান এবং তার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী।

এর আগে গত ১৩ মে রাজধানীর লালবাগে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বিশেষ অভিযান চালায় ঢাকা জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের নেতৃত্বে চালানো অভিযানে দীর্ঘ ২০ বছরের বেশি সময় ধরে অবৈধ দখলে থাকা এক একর জমি উদ্ধার করা হয়। জমিটি সরকারের আয়ত্তে নেওয়ার পর এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়। স্থানীয় লোকজন প্রশাসনের এই উদ্যোগকে ‘সাহসী ও নজিরবিহীন পদক্ষেপ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া মূল্যবান এই জমি ভবিষ্যতে জনকল্যাণমূলক প্রকল্প ও সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হবে।

অন্যদিকে ‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ৪৭টি চেকের মাধ্যমে ৮৮ জনকে মোট ৩৬ কোটি ৬৭ লাখ ৭৮ হাজার ৫১৭ টাকার ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে সবচেয়ে বেশি ই-নামজারি আবেদন জমা পড়ে ঢাকা জেলায় এবং নিষ্পত্তির তালিকাতেও শীর্ষে রয়েছে এই জেলা প্রশাসন। গত ৩০ দিনে ঢাকা জেলায় প্রায় ৩০ হাজার নামজারি আবেদনের বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে ২৩ হাজার ৬৩টি আবেদন। এসব আবেদন নিষ্পত্তিতে গড়ে সময় লেগেছে ১৯ দিন, যা ভূমি মন্ত্রণালয় নির্ধারিত ২৮ দিনের তুলনায় অনেক কম।