২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর। সেদিন সন্ধ্যায় রাজধানীর পরিস্থিতি অস্থির ও আতঙ্কময় হয়ে ওঠে।
বাঙালি সংস্কৃতির ওপর মরণাঘাত
কালের কণ্ঠ অনুসন্ধানী সেলের সংগৃহীত বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সেদিন রাতে কয়েক শ মানুষ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে ধানমণ্ডির ছায়ানট ভবনে। তাদের বেশির ভাগের মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল।
পরের দিন ১৯ ডিসেম্বর ভাঙচুর ও অগ্নিসন্ত্রাসে তছনছ করা হয় দেশের আরেক ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও।
শুধু ছায়ানট কিংবা উদীচী নয়, শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলে দেশের বেশির ভাগ শিল্প-সংস্কৃতির সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে আক্রান্ত হয়েছে। হামলা-ভাঙচুরের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা দেওয়া হয়েছে।
কালের কণ্ঠের অনুসন্ধান ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকেই শুরু হয় পরিকল্পিত আক্রমণ।
নাট্যজন মামুনুর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইউনূসের শাসনামলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে বর্বরোচিত হামলা হয়েছে। এসব হামলাকে পরিকল্পিত আক্রমণ মনে করি। এসব শুধু স্থাপনার ওপর নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপরও আঘাত। দেশের শিল্প-সংস্কৃতির প্রতীকগুলোকে পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।’
ছায়ানট : দুর্বৃত্তদের আগুনে পুড়ে যাওয়া হারমোনিয়াম, তবলাসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর
ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুনে ছারখার ছায়ানট
গাছগাছালিতে ঘেরা বড়সড় লাল ইটের ভবন। রাজধানীর ধানমণ্ডির শঙ্কর বাসস্ট্যান্ডের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবন আসলে সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য যেন এক তীর্থস্থান। সারা দিন এই ভবনে শিশু থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ—বয়সের ও শ্রেণির সংস্কৃতিপ্রেমীর পদচারণ চলে। এটিই বাঙালি সংস্কৃতির ছায়াবৃক্ষ—ছায়ানট। কাগজে-কলমে এর নাম ‘ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন’। ইউনূস জামানায় পরিকল্পিত তাণ্ডবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এই ভবন।
কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাত ১টার পর ধানমণ্ডির শঙ্কর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনের সামনে জড়ো হতে থাকে একদল সন্ত্রাসী। পরে তারা ভবনে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কয়েক শ মানুষ দলে দলে ভবনের ভেতরে ঢুকে বিভিন্ন তলায় হামলা চালায়। ভেঙে ফেলা হয় ছায়ানটের নামফলক, ভেতরের প্রতিটি কক্ষের আসবাব। নিচতলা থেকে শুরু করে ওপরের তলাগুলো পর্যন্ত চলে নারকীয় তাণ্ডব।
ভিডিওতে দেখা যায়, হামলাকারীরা মিলনায়তন, শ্রেণিকক্ষ, অফিসকক্ষ ও সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের কক্ষগুলোতে ব্যাপক ভাঙচুর করে। মনিটরিং সিস্টেম, লাইট, ফ্যান, কম্পিউটার, আসবাব তছনছ করে। মাটির তৈরি চারুকর্ম ও শিল্পকর্ম ভেঙে ফেলা হয়। বিভিন্ন কক্ষে থাকা কাগজপত্র ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।
ছয়তলা ভবনটির প্রতিটি তলায় হামলার চিহ্ন পাওয়া যায়। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কক্ষও রক্ষা পায়নি। আলমারির কাচ ভেঙে ফেলা হয়, চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করা হয়, জানালা ও ফ্যানও ভাঙচুর করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য ও ভিডিও ফুটেজ থেকে দেখা যায়, হামলাকারীদের অনেকেই মুখ কাপড়ে ঢেকে ও হেলমেট পরে এসেছিল। ভবনের বিভিন্ন তলায় ভাঙচুর শেষে তারা সামনের অংশে আগুন ধরিয়ে দেয়। হামলার সময় কয়েকজনকে বলতে শোনা যায়, ‘বাংলাদেশে ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চার কোনো জায়গা নেই।’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে এমন মন্তব্য শোনা যায়।
ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী লাইসা আহমেদ লিসা বলেন, ‘ছায়ানট ভবনে সকালে এসে দেখি, যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি ভবন। ছয়তলার সার্ভাররুম পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কক্ষ, মিলনায়তন, ক্লাসরুম—সবকিছু তছনছ করা হয়।’
তিনি এই ঘটনাকে ‘বর্বরোচিত হামলা’ উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের ধারণা, এটি সংস্কৃতিবিরোধী একটি চক্রের কাজ। হামলার ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। আমরা আশা করি, তদন্তের মাধ্যমে হামলাকারী ও পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করা হবে। পাশাপাশি হামলাকারী ও পরিকল্পনাকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে।’
ছায়ানটের প্রধান ব্যবস্থাপক দুলাল ঘোষ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছয়তলা ভবনের প্রতিটি তলায়ই ভাঙচুর করা হয়েছে। প্রতিটি তলার সিসি ক্যামেরা, কম্পিউটার, আসবাব ও বাদ্যযন্ত্র তছনছ করা হয়েছে। কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম লুটপাট হয়েছে। হারমোনিয়াম, তবলা, সেতার, তানপুরাসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলা হয়েছে, কিছু লুটপাট করা হয়েছে।’
বাঙালির সংস্কৃতি, ভাষা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ছায়ানট। এর আগেও সংগঠনটি হামলার শিকার হয়েছে। ২০০১ সালে রমনা বটমূলে বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানে ভয়াবহ বোমা হামলায় প্রাণ হারায় ১০ জন। আহত হয় অসংখ্য মানুষ। দুই দশক পর আবারও হামলার মুখে পড়ে দেশের এই ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।
উদীচী : ২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর তোপখানা রোডে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ
আগুনে পুড়ল উদীচীর ৫৭ বছরের ইতিহাস
ছায়ানটে হামলার এক দিন পরই রাজধানীর তোপখানা সড়কে অবস্থিত সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টা ৩৯ মিনিটের দিকে শুরু হওয়া এই হামলায় পুড়ে যায় সংগঠনটির বহু বছরের সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও গুরুত্বপূর্ণ আর্কাইভ।
কালের কণ্ঠ সংগৃহীত একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হামলার আগে একদল যুবক লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ভবনের ভেতরে ঢুকছে। তাদের অনেকের মুখ স্পষ্ট দেখা যায় ভিডিওতে। কিছুক্ষণ পরই ভবনের দোতলা থেকে আগুনের শিখা বের হতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, আগুন দেওয়ার আগে পুরো কার্যালয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। পরে বিভিন্ন কক্ষে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় রাত ৯টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
পাঁচতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় ছিল উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়। সেখানে সংরক্ষিত ছিল কয়েক হাজার বই, গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক নথিপত্র, পোস্টার, ব্যানার, কম্পিউটার ও আর্কাইভ। ছিল নাটকের ১০টি পূর্ণাঙ্গ সেট, যেগুলো তৈরি করতে লেগেছিল দীর্ঘ সময় ও শ্রম। আগুনে সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
উদীচীর ৫৭ বছরের সাংগঠনিক ইতিহাসও ছিল এই কার্যালয়ে সংরক্ষিত। কার্যনির্বাহী কমিটির সভার রেজল্যুশন, আন্দোলন-সংগ্রামের দলিল, সাংস্কৃতিক কর্মসূচির নথি—সবই আগুনে ধ্বংস হয়ে যায়।
উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর একাংশের সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন বলেন, ‘সেদিন আগুন লাগার খবর পেয়েই আমি ঘটনাস্থলে যাই। তখনো আগুন জ্বলছিল। পরে ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।’
নিপীড়িত মানুষের পক্ষে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৬৮ সালের ২৯ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। দেশের প্রায় সব জেলায় সংগঠনটির শাখা ও কার্যক্রম রয়েছে। ইউনূসের জামানায় বিভিন্ন জেলায় উদীচীর শাখা কার্যালয়েও হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন।
উদীচী : হামলার আগে দেশি অস্ত্র হাতে কার্যালয়ে ঢুকছেন কয়েক যুবক। ২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর সিসিটিভি ফুটেজ
হামলা হয় সরকারি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানেও
ছাত্র-জনতার এক দফার আন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেদিন দেশ ত্যাগ করেন, সেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর থেকেই সরকারি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর শুরু হয়। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই বছরের ৫ আগস্ট থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়। এ সময় ২২টি জেলায় শিল্পকলা একাডেমির স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও চুরির ঘটনা ঘটে।
রাজধানীর শিশু একাডেমিতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় শিশু একাডেমির শাখাও আক্রান্ত হয়। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প থাকায় বড় ধরনের হামলা থেকে রক্ষা পেলেও দেশের বিভিন্ন জেলার শিল্পকলা একাডেমিগুলো সহিংসতার শিকার হয়েছে। ভয়াবহ হামলা করা হয় ঝিনাইদহ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে। শহরের ক্যাসল সেতুর কাছে অবস্থিত তিনতলা ভবনটিতে হামলাকারীরা ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। জেলা কালচারাল অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. জসিম উদ্দিন জানান, ৪৫০ আসনের মিলনায়তন, মহড়াকক্ষ, কন্ট্রোলরুম, মঞ্চ, দর্শক গ্যালারিসহ বিভিন্ন স্থাপনা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আসবাব ও সরঞ্জামও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা, সাতক্ষীরা শিল্পকলা একাডেমি, সিরাজগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতেও হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। হামলা হয়েছে ময়মনসিংহ, লক্ষ্মীপুর, শেরপুর ও নওগাঁর শিল্পকলা একাডেমিতেও। নওগাঁর পত্নীতলা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কমপ্লেক্সে, জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি এবং মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে কয়েক দফা হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বরগুনা, সুনামগঞ্জ, রংপুর, খুলনা, মানিকগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, টাঙ্গাইলসহ আরো বিভিন্ন জেলা শিল্পকলা একাডেমির কার্যালয় আক্রান্ত হয়।
রাজধানীর দোয়েল চত্বরসংলগ্ন জাতীয় শিশু একাডেমি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভয়াবহ হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। প্রশাসনিক ভবন, জাদুঘর, পাঠাগার, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, প্রকাশনা বিভাগ—কোনো কিছুই রক্ষা পায়নি দুর্বৃত্তদের তাণ্ডব থেকে। ভাঙচুর করা হয় শিশু একাডেমির গাড়ি, ভাস্কর্য ও বিভিন্ন স্থাপনা। পরে একাধিক কক্ষে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় শিশু একাডেমির শাখা কার্যালয়েও হামলার ঘটনা ঘটে।
শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমির বিভিন্ন শাখায় হামলা-ভাঙচুর হলে গতিশীলতা হারায় সরকারি দুটি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম। তবে ইউনূস জামানায় দেড় বছরেও ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান মেরামত বা পুনর্নির্মাণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি চরম অবহেলা দেখায় প্রশাসন।
সুনামগঞ্জ : ২০২৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্বম্ভরপুরে ‘কৃষান চত্বর’ ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলে দুর্বৃত্তরা
জাদুঘর, ভাস্কর্য, ম্যুরাল ভাঙচুর
তিন রাস্তার মোড়ে একজন কৃষক হাতে কাস্তে এবং কাঁধে লাঙল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘কৃষাণ চত্বর’। গ্রামবাংলার কৃষি ও কৃষকের ঐতিহ্য তুলে ধরতেই সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরে নির্মাণ করা হয়েছিল ভাস্কর্যটি। ২০২৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে এই ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে একদল সন্ত্রাসী।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ওই ভাস্কর্য ভাঙার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন লোক হাতুড়ি দিয়ে ভাস্কর্যটি ভাঙছে। এ সময় পেছন থেকে স্লোগান দিতে বলা হয়।
২০২৪ সালের ৫ থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত অসংখ্য ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এ সময় দেড় হাজারেরও বেশি ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা—সবখানেই হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো। কোথাও আগুন দেওয়া হয়েছে, কোথাও হাতুড়ি-শাবল দিয়ে গুঁড়িয়ে ফেলা হয়েছে, আবার কোথাও পুরো স্থাপনা উপড়ে ফেলা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও থামেনি ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভে হামলা ও ভাঙচুর। সারা দেশেই মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে নির্মিত ম্যুরালে হামলা করা হয়েছে।
ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত নান্দনিক ভাস্কর্য ‘অঞ্জলি লহ মোর’ প্রশাসনিক নির্দেশে ভেঙে ফেলা হয়। এটি ২০২৫ সালের জুন মাসের ঘটনা। ম্যুরাল ভাঙচুরের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিমহল তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
বরগুনায় নির্মিত দেশের একমাত্র নৌকা জাদুঘরটি পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সকালে প্রকাশ্যে এটি ভেঙে ফেলা হয়। বরগুনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সংলগ্ন ৭৮ শতাংশ জায়গায় ১৬৫ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ৩০ ফুট প্রস্থের একটি বৃহদাকার নৌকার আদলে জাদুঘরটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এতে স্থান পায় বিভিন্ন অঞ্চলের বিলুপ্ত ও প্রচলিত ১০০ ধরনের নৌকার প্রতিকৃতি। ভাঙচুরে তছনছ হয়ে যায় গোটা জাদুঘর।
ত্রিশাল : কবি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অঞ্জলি লহ মোর’ ভাস্কর্যটি ২০২৫ সালের জুনে ভেঙে ফেলা হয়
হামলায় জড়িত কারা?
সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ও উদীচীতে হামলার ঘটনায় দুটি পৃথক মামলাও করা হয়েছে। দুটি প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের চার মাস পার হলেও ঘটনার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী বা সমন্বয়কারীরা এখনো চিহ্নিত হয়নি।
ছায়ানটে হামলার পরের দিন ধানমণ্ডি থানায় মামলা করেন ছায়ানটের প্রধান ব্যবস্থাপক দুলাল ঘোষ। মামলায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে ছায়ানটের প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
উদীচীতে হামলার দুই দিন পর রাজধানীর শাহবাগ থানায় অজ্ঞাতপরিচয়ের ১৪-১৫ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। মামলাটি করেন প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন। তিনি বলেন, ‘দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস, অরাজকতা সৃষ্টি এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যেই উদীচীর কার্যালয়ে এই নাশকতা চালানো হয়। হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়।’
উদীচী কার্যালয়ে হামলার আগে পাওয়া দুটি সিসিটিভি ফুটেজ কালের কণ্ঠের সংগ্রহে রয়েছে। সেখানে দেখা যায়, আট থেকে ১০ জন যুবক লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র হাতে ভবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কারো হাতে বস্তার মতো বস্তু ছিল বলেও ফুটেজে দেখা গেছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, যুবকদের দলটি ভবনে প্রবেশের কিছুক্ষণ পরই আগুনের শিখা দেখা যায়। আরেকটি ফুটেজে আগুন লাগার পর তাদের ভবন থেকে বের হয়ে যেতে দেখা যায়। হামলাকারীদের অনেকের মুখই স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ছায়ানট ও উদীচীতে হামলার ঘটনাকে একই চক্রের পরিকল্পিত তৎপরতা বলে মনে করছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, দুটি হামলার কিছু ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ছায়ানটে হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ধানমণ্ডি থানার পুলিশ।
ধানমণ্ডি থানার ওসি সাইফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ছায়ানটে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এরই মধ্যে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আরো অনেককে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, ছায়ানট ও উদীচীতে হামলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হয়। হামলার আগে প্রকাশ্যে উসকানি দিয়েছে অনেকেই। তাদের অনেককেই চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের পেছনে একাধিক স্বার্থান্বেষী মহল, উগ্রপন্থী গোষ্ঠী, অর্থদাতা ও প্রচার-সহযোগী সক্রিয় থাকতে পারে। এসব বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে আরো তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার এবং গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের মুখপাত্র এন এম নাসির উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, দুটি মামলা নিয়েই কাজ করছে প্রশাসন। প্রাথমিকভাবে কিছু হামলাকারী চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি হামলার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী, অর্থায়নকারী ও সংগঠকদের চিহ্নিত করতে কাজ করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। এ জন্য আরো সময় লাগবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেলেও নেপথ্যের সমন্বয়কারী ও অর্থদাতাদের বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। হামলার আগে কিভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, কারা অনলাইনে উসকানি দিয়েছে, রাজনৈতিক বা সংগঠিত কোনো গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা ছিল কি না—এসব প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, শুধু মাঠ পর্যায়ের হামলাকারীদের নয়, উসকানিদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের ভূমিকাও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ কারণে তদন্ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং এখনো অভিযোগপত্র জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
নাট্যজন মামুনুর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল দীর্ঘদিন ধরেই অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মুক্তবুদ্ধি ও মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে কাজ করে এসেছে। ফলে এই অঙ্গনকে দুর্বল করতে পারলে সমাজের প্রগতিশীল ধারাকেও আঘাত করা সহজ হয়। তাঁর মতে, ছায়ানট, উদীচী ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার ঘটনাগুলো একই ধারার অংশ। ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা নিউ এজ সম্পাদক সাংবাদিক নুরুল কবির বলেন, ‘পরিষ্কারভাবে আমরা জানি যে ছায়ানট ও উদীচী ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য এক দিন আগে, দুই দিন আগে থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কারা ঘোষণা দিয়েছে, এ দেশের সব মানুষ জানে, সরকারও জানে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশ্রয়ে ছায়ানট ও উদীচীতে হামলা করা হয়েছে ইঙ্গিত করে নুরুল কবির দাবি করেন, ‘সরকার তো তাদের গ্রেপ্তার করেনি আগেই প্রিভেন্ট করার জন্য। তারা তো আগেই ঘোষণা দিয়েছে—এগুলোকে ধ্বংস করা হবে। এ কারণেই আমরা বলেছি, সরকারের কোনো না কোনো অংশ এই ঘটনাটা ঘটতে দিয়েছে।’
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী সারা হোসেন বলেন, ছায়ানট ও উদীচীতে হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আজ থেকে ৫৪ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের সময় যেভাবে দেশের মেধা, মনন ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করতে শিল্পী, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিল, সেই একইভাবে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপরে হামলা চালানো হয়েছে। মূলত তারা স্তব্ধ করতে চেয়েছে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-সংস্কৃতির মানুষজনকে।
(শেষ)
উক্তি
ক্রিকেটের বড় দুই নাম সাকিব-মাশরাফির বিরুদ্ধে হত্যা মামলাগুলোর কোনো যুক্তি নেই। তবে তাঁদের নিজেদেরই ফিরতে হবে।
ইশরাক হোসেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী
অপুষ্ট শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে, হামে আরো ৫ মৃত্যু
দেশে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের ঘাটতি ও অপুষ্টির কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী ও অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মধ্যে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরো পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময় এক হাজার ৪০৫ শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে। তাদের মধ্যে এক হাজার ১৮৭ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নতুন করে হাম শনাক্ত হয়েছে ১১১ জনের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে জানানো হয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৭৫ জন। এ ছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরো ৩৮৯ জনের।
এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৫৪ হাজার ৯১১ শিশু। তাদের মধ্যে ৪২ হাজার ৮৬৮ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩৮ হাজার ৯৮০ জন। মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাত হাজার ৮৫৬ জনে।
হাম পরিস্থিতি নিয়ে ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড-১৯ হাসপাতালের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসক ডা. আসিফ হায়দার বলেন, দেশে হামের সংক্রমণ এখনো ঊর্ধ্বমুখী। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছে ১৫১ জন রোগী। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৫০০ রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে অনেক শিশু আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে আসছে। ভর্তি হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অনেকের মৃত্যু হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অপুষ্টি বড় কারণ। সুপুষ্ট শিশুরা আক্রান্ত হলেও দ্রুত সুস্থ হয়ে যাচ্ছে।
টিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো টিকাই শতভাগ সুরক্ষা দেয় না। তবে টিকা নেওয়া থাকলে রোগের তীব্রতা, নিউমোনিয়া ও গুরুতর ডায়রিয়ার মতো জটিলতা অনেক কমে যায়।
এদিকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘বাংলাদেশে হামের পুনরুত্থান : আজকের সংক্রমণ ও আগামী দিনের স্বাস্থ্যঝুঁকি’ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কভিড-১৯ মহামারির পর নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, টিকা নিতে অনীহা এবং অপুষ্টির কারণে দেশে আবারও হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।
শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জেসমিন মোর্শেদ বলেন, হাম সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও টিকা কাভারেজের ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, টিকাদান, দ্রুত শনাক্তকরণ, আইসোলেশন ও সময়মতো চিকিৎসাই হাম নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায়।
ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শারমিন সুলতানা বলেন, টিকা কার্যক্রমে ঘাটতির কারণে সমাজে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, হাম শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। এতে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক জটিলতাও তৈরি হতে পারে। অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
ভাইরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এস এম রাশেদ উল ইসলাম বলেন, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে প্রায় ৩৯ শতাংশ নিউমোনিয়ায় এবং ২৯ থেকে ৩৮ শতাংশ ডায়রিয়ায় ভুগছে। এ ছাড়া এনসেফালাইটিস, কানের সংক্রমণ ও ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতিজনিত অন্ধত্বের ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে টিকা নেওয়া শিশুদের রোগ তুলনামূলকভাবে হালকা।
সেমিনারে বক্তারা হাম প্রতিরোধে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল নিশ্চিত করা, মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো এবং অপুষ্টি দূরীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সন্তানহারা পিতার কাঁধে এখন ঋণের ভার
হাম শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, দরিদ্র পরিবারের জন্য বড় অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি করছে। একটি শিশু আক্রান্ত হলে পুরো পরিবারের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়
‘আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি ভাই। চিকিৎসা করাতে গিয়ে লাখ টাকার বেশি ঋণ হয়েছে। আমার আদরের মেয়ে জান্নাতকেও বাঁচাতে পারলাম না।’
কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের বাসিন্দা মোহাম্মদ নোমান। পেশায় তিনি একজন বুটিক কারিগর। হাম কেড়ে নিয়েছে তাঁর একমাত্র সন্তানকে। শোকের জগদ্দল ভারের সঙ্গে এখন তাঁর জীবনে যোগ হয়েছে ঋণের ভারও।
গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নোমান জানান, মেয়েকে বাঁচাতে যা ছিল সব খরচ করেছেন। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, পরিচিত মানুষ—সবার কাছেই হাত পাততে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সন্তানকে বাঁচানো যায়নি।
আট মাস পূর্ণ হওয়ার ঠিক এক দিন আগে গত ১৩ মে বিকেল ৪টায় ঢাকার মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে মারা যায় নোমানের একমাত্র মেয়ে জান্নাত। হামে আক্রান্ত হওয়ার পর জান্নাত নিউমোনিয়ার জটিলতায় ভুগছিল।
নোমান বলেন, ‘মেয়েটা অসুস্থ হওয়ার পর প্রথমে স্থানীয় ডাক্তার দেখাই। পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নিই। একটার পর একটা পরীক্ষা, ওষুধ, হাসপাতালের খরচ—সব মিলিয়ে এখন আমি লাখ টাকার বেশি ঋণে পড়েছি।’
রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া আরেক শিশু তাসমিদের বাবা মো. নয়নও একইভাবে ভেঙে পড়েছেন। সামান্য বেতনে চাকরি করা এই বাবা সন্তানের চিকিৎসার জন্য আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী—এমনকি স্থানীয় দোকানদারের কাছেও ধার করেছেন।
তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে যাতায়াত, ওষুধ, পরীক্ষা আর খাবারের খরচ মিলিয়ে কয়েক দিনেই প্রায় ৪০ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে। আরো টাকার জন্য মানুষের কাছে হাত পাতছি। কিন্তু এর মধ্যেই আমার প্রিয় তাসমিদ চলে গেল।’ নয়ন বলেন, ‘কোনোমতে সংসার চলত। এখন ঋণের চাপে কী করব বুঝতেছি না।’
হামে মারা যাওয়া অন্তত ১০টি শিশুর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে প্রায় একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানা গেছে। বেশির ভাগ পরিবারই নিম্ন আয়ের। সন্তানকে বাঁচাতে কেউ গয়না বিক্রি করেছেন, কেউ আত্মীয়-স্বজন বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, দরিদ্র পরিবারের জন্য বড় অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি করছে। একটি শিশু আক্রান্ত হলে পুরো পরিবারের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। হাসপাতালে দীর্ঘদিন থাকতে হয়, বাড়ে ওষুধ, পরীক্ষা ও পুষ্টিকর খাবারের খরচ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চিকিৎসা খরচের এই আতঙ্কে অনেক গরিব মানুষ তাদের অসুস্থ শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। তাঁরা ভাবছেন, হয়তো এমনিতেই সেরে যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তাঁরা ভিটামাটি বা ঘটি-বাটি বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হয়ে হাসপাতালের দিকে ছোটেন। এভাবে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে আমাদের দেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আজ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে এবং গ্রাম থেকে দারিদ্র্য বাড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই উচ্চ স্বাস্থ্য ব্যয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে সবার জন্য প্রাথমিক ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিশ্চিত করতে হবে। যাঁরা এই মহামারিতে প্রিয়জন হারিয়েছেন কিংবা সর্বস্বান্ত হয়েছেন, সরকারকে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং সামাজিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর রোগীদের ফলোআপ চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র যেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে এমন একটি টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার, যেখানে চিকিৎসার প্রতিটি খরচ সরকার বহন করবে। আমরা চাই এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যেখানে অর্থের অভাবে কোনো শিশুকে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে না।’
হামের চিকিৎসায় কত খরচ? : হামের চিকিৎসায় গড় ব্যয় নিয়ে এখনো কোনো সরকারি গবেষণা নেই। তবে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া শিশুর অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালের সাধারণ শয্যায় চিকিৎসা নিতে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। জটিলতা থাকলে তা ৫০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই খরচের মধ্যে রয়েছে যাতায়াত, খাবার, স্থানীয় চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের ব্যয়।
অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গড়ে ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। কোনো শিশুর পিআইসিইউ প্রয়োজন হলে খরচ তিন লাখ টাকারও বেশি হচ্ছে।
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড-১৯ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আট মাস বয়সী রাফসানের বাবা স্বপন খান জানান, সন্তানের চিকিৎসায় তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। এই টাকা তিনি কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন।
পটুয়াখালীর ঝাউফল এলাকার বাসিন্দা স্বপন বলেন, ‘পটুয়াখালী থেকে ঢাকায় আসতেই চার হাজার টাকা গেছে। ঢাকায় বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে আরো দেড় হাজার টাকা খরচ। হাসপাতালে আসার আগে প্রাইভেট চেম্বারে চিকিৎসা নিতে আট হাজার টাকা গেছে। স্থানীয় হাসপাতালে আরো ১৬ হাজার টাকা খরচ করেছি।’
তিনি বলেন, হাসপাতালে ভর্তির পর বেশির ভাগ ওষুধ সরকার থেকে পেলেও কিছু পরীক্ষা বাইরে থেকে করাতে হয়েছে। ব্লাড সিরাম ফেরিটিন, হিমোগ্লোবিন ই পরীক্ষা, হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস, ব্লাড সিরাম টিআইবিসি—এসব পরীক্ষার পেছনেও খরচ হয়েছে। স্বপন খান বলেন, ‘ঋণ কেমনে শোধ করমু জানি না। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আমার ছেলেটা এখনো বেঁচে আছে!’
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড-১৯ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আসিফ হায়দার বলেন, বর্তমানে হাসপাতালের প্রায় ৯০ শতাংশ পরীক্ষা সরকারি খরচে করা হচ্ছে। এ ছাড়া আইজিএম পরীক্ষার মতো বিশেষ পরীক্ষাও বিনামূল্যে করানো হচ্ছে।
তিনি জানান, মেরোপেনেম বা ভ্যানকোমাইসিনের মতো উচ্চমূল্যের অ্যান্টিবায়োটিক সরকার থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। শিশুদের জন্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার, ডিম ও গুরুতর অসুস্থদের বিশেষ ডায়েটও দেওয়া হচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করেন, ঢাকার বাইরে থেকে অনেক শিশু অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় আসছে। অপুষ্ট শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
শিশু হাসপাতালেও খরচ দ্বিগুণ : বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি শিশুদের কয়েকজন অভিভাবক জানান, এক সপ্তাহে তাঁদের খরচ ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। তাঁরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন পরীক্ষা, ইনজেকশন, স্যালাইন, ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্টসহ প্রয়োজনীয় অনেক কিছু বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
বরিশাল থেকে অসুস্থ শিশু আলিফকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন জুয়েল-তন্বী দম্পতি। তিন দিন স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়ার পর অবস্থার অবনতি হলে তাঁরা রাজধানীতে আসেন। পেশায় গাড়িচালক জুয়েল বেপারী বলেন, ‘বাচ্চা অসুস্থ হওয়ার আগেই চাকরি হারাইছি। ঢাকায় এসে কয়েকটা হাসপাতালে ঘুরেও ভর্তি করাতে পারিনি। পরে শিশু হাসপাতালের বারান্দায় অপেক্ষা করছি। বেড খালি হলে ভর্তি করাতে পেরেছি।’ তিনি জানান, আগে মাসে ২৩ হাজার টাকা বেতন পেতেন। এখন ধারদেনা করে সন্তানের চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে।
জুয়েল বলেন, ‘একটা বেসরকারি হাসপাতালে মাত্র এক ঘণ্টা ছিলাম। সেখানেই ১৩ হাজার টাকা বিল আসে। টাকা না থাকায় চলে আসি। চার দিন ধরে শিশু হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে আলিফ। জুয়েলের ভাষায়, ‘বরিশাল আর ঢাকা মিলিয়ে এক সপ্তাহে ৫০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করে চলতেছি। কিন্তু এভাবে আর বেশিদিন পারব না।’
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘কমপ্লিকেটেড মিজলস’ বা হাম-পরবর্তী জটিলতা। তিনি বলেন, শিশুরা এখন শুধু হাম নিয়ে আসছে না; তারা নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার মতো জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে দুই থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত ভর্তি রাখতে হচ্ছে।
তিনি জানান, গুরুতর রোগীদের জন্য ১৪ বেডের বিশেষায়িত আইসিইউ চালু করা হয়েছে, যা সব সময় পূর্ণ থাকছে। ডা. আতিকুল বলেন, জেলা পর্যায়ে আইসিইউর সংকট থাকায় রোগীরা ঢাকায় আসছে। সময়মতো আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সাপোর্ট পেলে অনেক মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতো।
বেসরকারি হাসপাতালে কয়েক গুণ বেশি ব্যয় : অভিভাবকদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে গেলে অল্প সময়েই কয়েক গুণ বেশি খরচ হয়ে যাচ্ছে। হামে আক্রান্ত ১১ মাস বয়সী কন্যা আরশিয়াতুল ইনায়া আয়াতকে নিয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন পলাশ মিয়া। তিনি বলেন, কেবিন ভাড়া দৈনিক আড়াই হাজার টাকা। এর বাইরে অক্সিজেন, ওষুধ, ডাক্তার ফি—সব মিলিয়ে আড়াই লাখ টাকার মতো খরচ হতে পারে বলেছেন ডাক্তার। একজন চিকিৎসক জানান, বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে একটি শিশুকে রাখলে প্রতিদিন ২৫ হাজার টাকার বেশি বিল আসতে পারে, যা বেশির ভাগ পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।
বদলাতে পারে র্যাবের নাম : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
জবাবদিহিমূলক এলিট ফোর্স গঠনে নতুন আইন হচ্ছে
পুলিশের এলিট ফোর্স হিসেবে র্যাব পরিচালনায় নতুন আইন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, আগামী দিনে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে এই এলিট ফোর্স তার সব কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এ জন্য একটি নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই বাহিনীর নামও পরিবর্তন হতে পারে।
গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর কুর্মিটোলায় র্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময়সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য, পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন তিন বাহিনীর প্রধানরা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থার প্রধানরাসহ বিভিন্ন সামরিক-অসামরিক কর্মকর্তারা।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির। স্বাগত বক্তব্য দেন র্যাবের মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশ। বর্তমানে র্যাব আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইনের কিছু ধারার অধীনে পরিচালিত হচ্ছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এটি দীর্ঘদিন ধরে ‘অ্যাডহক’ ভিত্তিতে চলেছে। একটি বাহিনী এভাবে পরিচালিত হওয়া ঠিক নয়। তাই এখন আমরা একটা আইন করব আলাদা এলিট ফোর্সের জন্য, এখানে অথরিটি দেওয়া থাকবে, তাদের রেসপনসিবিলিটি সুনির্দিষ্ট করা থাকবে এবং তার ভিত্তিতে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। এটা এখনো ‘ডিটেইল’ বলার সময় আসেনি।”
র্যাব থাকছে কি থাকছে না—এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা একটি নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছি। নতুন আইনে নতুন একটি এলিট ফোর্স গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে সরকার। যে আইনের অধীনে এলিট ফোর্স হিসেবে একটি বাহিনী থাকবে। আমরা র্যাবের নাম পরিবর্তন করব কিনা বা অন্য নতুন এলিট ফোর্স আমরা গঠন করব কি না, সেটা এখনো চিন্তা-ভাবনার বিষয়।’ দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত নিয়ন্ত্রণ ও স্বাভাবিক রাখতে একটি এলিট ফোর্সের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সে বিবেচনায় র্যাবের বিদ্যমান আইন পরিবর্তন ও সংশোধনপূর্বক এটিকে যুগোপযোগী ও বিশ্বমানের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; যাতে করে এলিট ফোর্সটির সদস্যদের পেশাদারির পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।’ র্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমেরিকা যখন র্যাবের ওপর স্যাংশন দিয়েছিল তখন র্যাব রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, কিছু প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। ফ্যাসিবাদী সরকার তাদের একদলীয় শাসন কায়েমের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছে। সে কারণেই র্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, যা এখনো বহাল রয়েছে। তিনি বলেন, ‘সেই সময় ফ্যাসিবাদী সরকারের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য, একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করার জন্য এই জাতীয় অনেক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছে। কিন্তু আমরা যদি এলিট ফোর্স হিসেবে একটা নতুন ফোর্স রিনেম (নাম পরিবর্তন) করি বা পুনর্গঠন করি, সেখানে হয়তো তাঁরা বিষয়ট পুনর্বিবেচনা করবেন। সেটা আশা করা যায়, তবে এখনো অনেক কিছু বাকি আছে...দেখা যাক।’
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না, যেটা ফ্যাসিস্ট শাসনামলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সেটা পুলিশ, সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু আমাদের স্মরণ রাখতে হবে কয়েকজন কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডের দায় পুরো প্রতিষ্ঠান নিতে পারে না। যার যার প্রতিষ্ঠানের আইনে এবং প্রচলিত আইনের সব কর্মকর্তাকে অ্যাকাউন্টেবল করার জন্য আমরা অলরেডি অনুশাসন দিয়েছে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এলিট ফোর্স হিসেবে নতুন কিছু গড়ে তোলা সম্ভব হলে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র পুনর্বিবেচনা করবে বলে বিশ্বাস করি।’ র্যাবকে ফের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে কি না প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের গেল কয়েক মাসের কাজের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে। তিন মাস হয়ে গেল। এর মধ্যে পুলিশ কি ব্যবহৃত হয়েছে? র্যাব কি ব্যবহৃত হয়েছে, পলিটিক্যাল উদ্দেশে অন্য কোনো বাহিনী কি ব্যবহৃত হয়েছে? সুতরাং মর্নিং শোজ দ্য ডে।’ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব সুনাম ও গৌরব বজায় রেখে কাজ করে যেতে হবে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না। বিশ্বের কাছে এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করতে হবে যে বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি রয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’
প্রসঙ্গত, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে জঙ্গিবাদের উত্থান ও আইন-শৃঙ্খলার ক্রমাগত অবনতির মধ্যে ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, আনসার ও ভিডিপি, বিজিবি ও কোস্ট গার্ড সদস্যদের নিয়ে র্যাব গঠিত হয়। পরে ‘ক্রসফায়ার’ ও ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ওঠে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে। বিএনপির পর আওয়ামী লীগের সময়ও এর ধারাবাহিকতা দেখা যায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একাধিকবার র্যাব ভেঙে দেওয়ার আহবান জানালেও আগের সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। এমনকি যিনি ক্ষমতায় থাকতে র্যাব গঠিত হয়েছিল, সেই সাবেক প্রধানমন্ত্রীও পরে আওয়ামী লীগ আমলে র্যাব বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছিলেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগে র্যাব এবং এর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার। এরপর র্যাবের ‘ক্রসফায়ার’ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) র্যাব বিলুপ্তির পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) কেবল সীমান্ত রক্ষা এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা পরিদপ্তরকে সামরিক গোয়েন্দা তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুপারিশ করে। সেসব আহ্বানে সাড়া না দিয়ে র্যাব গঠনের ২২ বছর পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার এ বাহিনীর নাম পরিবর্তন করার কথা বলে। ওই সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছিলেন, ‘র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাবের নতুন নাম হবে স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স বা এসআইএফ।’
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দক্ষতা বাড়াতে সিঙ্গাপুর সহযোগিতায় আগ্রহী : বাংলাদেশের পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পেশাগত দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে প্রযুক্তিগত ও প্রশিক্ষণ সহযোগিতা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে সিঙ্গাপুর।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে সিঙ্গাপুরের অনিবাসী হাইকমিশনার ডেরেক লো এ আগ্রহের কথা জানান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ফয়সল হাসান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছেন।
বৈঠকে দুই দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি, পুলিশের প্রশিক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা, আন্ত দেশীয় সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ দমন, তথ্য বিনিময়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং ফৌজদারি বিষয়ে পারস্পরিক আইনি সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়।